শুক্রবারও দেশজুড়ে বেহাল ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা, ক্ষমা চাইল কর্তৃপক্ষ, শিথিল হল ডিজিসিএ-র বিধি
- The Conveyor
- Dec 5, 2025
- 3 min read

কলকাতা, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫: বৃহস্পতিবার রেকর্ড সংখ্যক বিমান বাতিলের পর শুক্রবারও দেশজুড়ে বেহাল ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা। যাত্রীসংখ্যায় বৃহত্তম ডোমেস্টিক এয়ার লাইন্সের পরিষেবার এমন অবস্থার কারণে ভোগান্তির শিকার লক্ষ লক্ষ যাত্রী। জল নেই, খাবার নেই, স্তূপাকার হয়ে পড়ে রয়েছে যাত্রীদের লাগেজ। কার্যত ধসে পড়েছে ওই সংস্থার পরিষেবা। শুক্রবারও দেশের প্রায় সমস্ত প্রান্তের সব অন্তর্দেশীয় বিমান বাতিল করেছে ইন্ডিগো। গত চার দিন ধরে চলতে থাকা জটিলতার জন্য পরোক্ষ ভাবে কর্মীদের উপরেই দায় চাপিয়েছে সংস্থা। এই পরিস্থিতিতে ইন্ডিগো-র কর্মীদের একটি খোলা চিঠি প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। অপরদিকে, ইন্ডিগোর চারদিনের ভয়াবহ ‘মেল্টডাউন’ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
ইন্ডিগোর যাত্রীদের অভিযোগ, যথাযথ খাবার এবং আশ্রয় ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন তাঁরা। কিন্তু ঠিক কোন সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যের বিমান ছাড়বে, তা বিমানসংস্থার তরফে জানানো হচ্ছে না। অন্য দিকে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্য বিমানসংস্থাগুলি বিমানের টিকিটের দাম চড়চড় করে বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি জারি করেছে ইন্ডিগো। এমনকী আগামী ১০ দিনে ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বের জন্য পুরো ভাড়া ফেরত দিতেও রাজি বলে জানিয়েছে ইন্ডিগো। বিমান সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সমস্ত ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। একইসঙ্গে ইন্ডিগো জানিয়েছে, এই সমস্যার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত সমস্ত যাত্রী স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের টিকিট বুকিংয়ের পুরো অর্থই ফেরত পাবেন। ৫ তারিখ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ইন্ডিগোর বিমানে টিকিট কাটা থাকলে তা বাতিল বা সফরসূচি পরিবর্তিত হলে যাত্রীরা ভাড়া বাবদ পুরো অর্থই ফেরত পাবেন। এয়ারপোর্টে আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য হোটেলে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থা। যদিও যাত্রীদের ভোগান্তির ছবি অন্য কথা বলছে। তবে ভোগান্তি এড়াতে ফ্লাইট টাইম চেক না করে যাত্রীদের এয়ারপোর্টে না আসার অনুরোধ করেছে ইন্ডিগো।
ইন্ডিগো-র পাইলট থেকে শুরু করে বিমানকর্মী, কেবিন ক্রু এবং গ্রাউন্ড স্টাফদের পক্ষ থেকে একটি খোলা চিঠি লেখা হয়েছে। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রত্যেকটি বিমানবন্দরে যাত্রীদের রোষের মুখে পড়তে হয়েছে ইন্ডিগো-র কর্মীদের। সাধারণ মানুষ কর্মীদের উপরেই তাঁদের রাগ উগড়ে দিচ্ছেন, কর্মীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছে। ইন্ডিগো কর্মীদের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ডিজিসিএ বিমানসংস্থাগুলির জন্য যে কঠোর গাইডলাইন বলবৎ করেছে, সেগুলি শিথিল করার জন্য পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতেই ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষ বিমান বাতিলের এই কৌশল নিয়েছে। চিঠিতে লেখা হয়েছে, ঠিক যে সময়ে ডিজিসিএ-এর নতুন বিধিনিষেধ বলবৎ হওয়ার কথা, ঠিক তখনই এই ব্যাপক হারে বিমান বাতিলের ঘটনা ঘটল। ফলে আসলে কী ঘটছে, তা সবার কাছেই স্পষ্ট। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সংস্থার পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ব্যর্থতা রয়েছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে আরও বাড়তে দেওয়া হয়েছে। যাতে সরকারের উপরে এই নতুন গাইডলাইন কার্যকর করার সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য চাপ দেওয়া যায়।
অপরদিকে এই পরিস্থিতিতে ইন্ডিগোর ‘মেল্টডাউন’ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, 'ভারত সরকার এই বিশৃঙ্খলা বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই তদন্ত ইন্ডিগোর কী ভুল হয়েছে তা পর্যালোচনা করবে, যথাযথ পদক্ষেপের জন্য যেখানে প্রয়োজন সেখানে জবাব তলব করবে এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের বিশৃঙ্খলা রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে, যাতে যাত্রীরা ফের এই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন না হন।'
ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার নেপথ্যে দেশের উড়ান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ-র একটি বিধিকে দায়ী করা হচ্ছে। বিমান পরিষেবায় নিরাপত্তা আরও মজবুত করতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে পাইলট এবং বিমানকর্মীদের কাজের সময় এবং বিধি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল দেশের। ‘ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশনস’ নামের ওই বিধিতে বলা হয়েছিল প্রতি সপ্তাহে পাইলট এবং বিমানকর্মীদের বিশ্রামের জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে মাত্র ২টি বিমান রাতে অবতরণ করাতে পারবেন এক জন পাইলট (আগে সংখ্যাটা ছিল ৬)। তা ছাড়া ওই বিধিতে বলা হয়, পাইলট এবং বিমানকর্মীদের পর পর দু’দিন নাইট ডিউটি দেওয়া যাবে সপ্তাহে এক বারই। ইন্ডিগো তুলনায় সস্তায় বিমান পরিষেবা দিয়ে থাকে যাত্রীদের। নয়া বিধি মেনে পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে যত সংখ্যক কর্মী এবং পাইলট প্রয়োজন, বর্তমানে তা ইন্ডিগোর নেই। পাইলট এবং কর্মী অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করে ইতিমধ্যেই যাত্রীদের কাছে একাধিক বার ক্ষমাও চেয়েছে ইন্ডিগো। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুক্রবার এই সংক্রান্ত নিয়মটি শিথিল করা হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে বিমান পরিষেবা স্বাভাবিক করার কথা বলা হলেও মনে করা হচ্ছে, ইন্ডিগোকে সুরাহা দিতেই বিধি শিথিল করা হয়েছে।
শুক্রবার বিমানসংস্থা জানিয়েছে, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কাছে খাবার এবং জল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। যাত্রীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন শহরে হোটেলের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে ইন্ডিগো। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, শনিবারের মধ্যে ইন্ডিগোর পরিষেবার হাল অনেকটাই ফেরানো সম্ভব হবে৷ তবে পরিষেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও তিন দিন সময় লাগতে পারে বলে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক মনে করছে৷ সেক্ষেত্রে সোমবারের মধ্যেই ইন্ডিগো-র পরিষেবা স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এক লাফে দ্বিগুণ-তিনগুণ-চারগুণ বেড়েছে ভাড়া। এমনকী দেশের ব্যস্ততম রুটগুলির ভাড়া এখন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের রাউন্ড ট্রিপের চেয়েও বেশি। দিল্লি–মুম্বইয়ের (Delhi-Mumbai) রিটার্ন টিকিট এখন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। সাধারণত শেষ মুহূর্তে বুক করলে যেটি ২০ হাজারের আশপাশে পাওয়া যায়। ওয়ানওয়ের জন্য লাগছে প্রায় ৩৫ হাজার। দিল্লি-কলকাতার ফ্লাইটের দাম আজ প্রায় ৩২,০০০ টাকা। আগামিকাল একই রুটে রাউন্ড ট্রিপের ভাড়া হয়ে গিয়েছে ৮৫,০০০ টাকা। অর্থাৎ ইউরোপ ভ্রমণের চেয়ে ব্যয়বহুল হতে চলেছে কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার ভাড়া। তুলনায়, দেশের সবচেয়ে সস্তা দিল্লি-লন্ডন ফ্লাইটের দাম প্রায় ২৫,০০০ টাকা, দিল্লি-প্যারিসের দাম ২৫,০০০ টাকারও কম। আর উভয় গন্তব্যে রাউন্ড ট্রিপের খরচ ৬০,০০০ টাকারও কম।









Comments