আইপ্যাকের দফতর তথা কর্ণধারের বাড়িতে ইডি হানা এবং মুখ্যমন্ত্রী সহ মন্ত্রীকুল এবং পুলিশের সক্রিয় উপস্থিতি- ফাইল হস্তগত করা- দিনভর সরগরম থাকল শহর এই নিয়েই
- The Conveyor
- Jan 8
- 3 min read

কলকাতা, ৮ জানুয়ারি, ২০২৫: বৃহস্পতিবার আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে ED তল্লাশি ঘিরে উত্তেজনা। একই সঙ্গে আইপ্যাকের সল্টলেকের দপ্তরেও তল্লাশি অভিযান চলেছে। ঘটনার খবর পেতেই পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে পৌঁছন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মাও। সল্টলেকেও যান মুখ্যমন্ত্রী। সল্টলেকের IPAC-এর অফিসে এবং পোস্তা এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে সকাল থেকে তল্লাশি শুরু করে ইডি। কলকাতার একাধিক জায়গায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অভিযান চালাচ্ছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের একাধিক দল। দিল্লি থেকে ইডি-র টিম এসেছে অভিযানে। কলকাতার দলকে নিয়েই অভিযান চালানো হয় ৷ একাধিকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ইডির অফিসাররা ৷
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আইপ্যাকের দফতর এবং ওই সংস্থার কর্ণধার প্রতীকের বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চলছে। ইডি সূত্রের খবর, কয়লাপাচার কাণ্ডে দিল্লিতে নথিভুক্ত এক পুরনো মামলার জন্যই এই অভিযান। ওই মামলায় বেশ কিছু লেনদেনের সূত্রে আইপ্যাকের নাম এসেছে বলে ইডি সূত্রের খবর। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়েই ইডি ওই অভিযান শুরু করেছে। আচমকা ওই অভিযানে আইপ্যাকের পুরো টিমই খানিকটা হতচকিত হয়ে পড়েছিল। ভোরে যখন অভিযান শুরু হয়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আইপ্যাকের দফতরে বিশেষ কেউ ছিলেন না। ছিলেন নাইট ডিউটিতে কর্মরত কয়েক জন। তাঁদের সামনেই অভিযান শুরু হয়। সেক্টর ফাইভের একটি বহুতলের ১২ তলায় আইপ্যাকের দফতর। ওই তলাটি ‘সিল’ করে দেয় কেন্দ্রীয় বাহিনী। ফলে ওই দফতরে ঢোকা বা বেরোনো আপাতত বন্ধ।
বৃহস্পতিবার সকালে প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরেই সেখানে পৌঁছে যান কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। তার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সেখানে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বেলা ১২ তা নাগাদ গাড়ি থেকে নেমে দ্রুতগতিতে প্রতীক জৈনের বাড়িতে ঢুকে যেতে দেখা যায় তাঁকে। প্রতীক জৈনের বাড়িতে ঢোকার মিনিট পনেরো পরে হাতে একটি সবুজ রঙের ফাইল এবং একটি ল্যাপটপ নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় মমতাকে। বেরিয়ে এসেই মিনিট পাঁচেকের জন্য সংবাদমাধ্যমের সামনে বক্তব্য রাখেন মমতা। সেখানেই আগাগোড়া কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং ইডির বিরুদ্ধে তোগ দাগেন তিনি। তৃণমূলের গোপন নথি লোপাট করার জন্যই ইডি এই তল্লাশি করেছে বলে অভিযোগ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার অভিযোগ, তৃণমূলের কৌশলগত নথি, প্রার্থী তালিকা এবং অন্যান্য নথি লোপাট করার জন্য হানা দিয়েছে ইডি। প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বেরিয়েই মমতা বলেছিলেন তিনি সল্টলেকের আইপ্যাক অফিসেও যাবেন। সেই মতো কিছুক্ষণের মধ্যে সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিসে পৌঁছে যান মমতা।
দুপুর ১টার বেশ কিছুক্ষণ আগে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের অফিসে ঢুকতে দেখা গিয়েছে মমতাকে। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর এক নিরাপত্তারক্ষীকে দেখা যায় একগুচ্ছ ফাইল হাতে করে এনে একটি গাড়ির ডিকিতে রাখতে। সেই গাড়িটি সাদা রঙের একটি SUV। তখন সেই গাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের দলের সদস্যদের। বিপুল সংখ্যায় রাজ্যের বাহিনী আসে সল্টলেকের ওই বহুতলে। আসে ব়্যাফও। রাজ্যের পুলিশের তরফেও দড়ি দিয়ে ঘিরে দিতে দেখা যায় ওই এলাকা। মু্খ্যমন্ত্রী পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগে ওই অফিসে পৌঁছে যান বিধাননগর পুরনিগমের চেয়ারম্যান কৃষ্ণা চক্রবর্তী। মমতা পৌঁছনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুও পৌঁছন বলে সূত্রের খবর। সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিসে পৌঁছে গিয়েছেন ডিজি রাজীব কুমারও। ইডি তল্লাশির এই ঘটনার প্রতিবাদ করে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মাঠে নামার ডাক দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সল্টলেকে আইপ্যাক-এর দফতর থেকে বেরোতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়লেন ইডির আধিকারিকেরা। উঠল ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। ইডির উদ্দেশে ‘বিজেপির দালাল’ বলেও স্লোগান দিতে থাকেন তৃণমূলের কর্মী সমর্থকেরা। ওঠে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিও। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ ওই দফতর থেকে নীচে নামেন ইডির আধিকারিকেরা। এর পরেই শুরু হয় বিক্ষোভ এবং স্লোগান। এরই প্রতিবাদে শুক্রবার কলকাতায় প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তাঁর নির্দেশেই বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই জেলায় জেলায় চলছে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। শুক্রবার দুপুর দু’টোয় যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হবে তৃণমূল কংগ্রেসের মিছিল। নেতৃত্বে থাকবেন মমতা। মিছিল শেষ হবে হাজরা মোড়ে।
অপরদিকে নাম না করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নথি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সেইসঙ্গে মমতার অভিযান নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছে। ইতিমধ্যে মামলা দায়েরের অনুমতি মিলেছে। শুক্রবার মামলার শুনানি হতে পারে। ইডির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে (১০টির মধ্যে) দুটি জায়গায় সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি-সহ কয়েকজন বেআইনিভাবে ঢুকে পড়েন এবং নথি ছিনিয়ে নিয়ে চলে যান।’ যদিও মুখ্যমন্ত্রী যখন নথি নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ইডি কেন বাধা দেয়নি? ইডি কেন তখন আটকায়নি? তা নিয়ে অবশ্য কেন্দ্রীয় সংস্থার তরফে কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে বিজেপি সূত্রের দাবি, ইডি হানার গতিপ্রকৃতি এবং তার ফলাফল সম্পর্কে শীর্ষনেতৃত্ব ‘আত্মবিশ্বাসী’। তাই তাঁরা ‘বিচলিত’ হননি। প্রতীকের বাড়ি বা আইপ্যাক দফতর থেকে মুখ্যমন্ত্রী নানা নথি নিয়ে গিয়েছেন বলে তিনি নিজে দাবি করা সত্ত্বেও বিজেপি নেতৃত্ব অবিচলিত। তাঁদের ব্যাখ্যা, দলের মনোবল ধরে রাখতে মমতা ‘নথি সরানোর’ ছবি তৈরি করেছেন। এক নেতার কথায়, ‘‘অনেকটা ‘দৃশ্যম’ ছবির মতো।’’ বিজেপির ওই অংশের আরও ব্যাখ্যা, তৃণমূল তথা রাজ্য সরকারেরর পরামর্শদাতা সংস্থার দফতরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা হানা দিল আর মুখ্যমন্ত্রী কিছু করলেন না, এই বার্তা ছড়িয়ে গেলে মমতার ‘রাজনৈতিক ক্ষতি’ হত। রাজ্য জুড়ে তৃণমূল কর্মীদেরও মনোবল ভেঙে যেত। তাই মুখ্যমন্ত্রী কিছু ছবি তৈরি করেছেন। এমন একটা ভাষ্য তৈরি করেছেন যে, ইডি ‘তেমনকিছু’ করতে পারেনি।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাবমূর্তির কফিনে নিজেই শেষ পেরেক পুঁতে দিলেন! তিনি যা করছেন, তাকে অনৈতিক না বলাই ভাল। এটা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত এবং ফৌজদারি অপরাধ। সরকারি সংস্থার তদন্তের কাজে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বাধা দিয়েছেন। রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখে যতটুকু বলা যায়, আমরা সেটুকুই বলছি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা যা ঘটিয়েছেন, তা গোটা ভারতে ‘নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন শমীক।









Comments