পদ্ম ঝড়ে উপড়ে গেল ঘাসফুল
- The Conveyor
- May 4
- 4 min read

কলকাতা, ৪ মে, ২০২৬: ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর ধুতি- পাঞ্জাবির বেশটাকেই হাইলাইট করব, কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভবানীপুরে যেভাবে টানটান উত্তেজনা রইল, সেটাই আজকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য বলে আমার মনে হল। তাই এই ১৫ বছরের অবসানে যেমন চ্যাম্পিয়ন বলেছিলাম নির্বাচন কমিশনকে, তেমনি হ্যাট্স অফ বলতে হয় বাংলার সাধারণ নাগরিককে, এই বিপুল পরিমান ভোট প্রদান করার জন্য। পাশাপাশি ভোটের ফলাফলে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতেই হবে বিজেপির স্ট্র্যাটেজিক। একেবারে অংক কষে বলে বলে সকলে মিলে তৃণমূলকে একেবারে সাফ করে দিলেন। শুভেন্দু যেমন যেমন বলেছিলেন, তেমন তেমনভাবেই এক এক করে রাউন্ড পার করতে করতে দিনের শেষে ভিক্ট্রি সাইন দেখানোর দাবিদার হয়ে গেলেন। জয়ের পরেই তাঁর মন্তব্য, ‘‘এ জয় হিন্দুত্বের জয়, বাংলার জয়, মোদীজির জয়।’’ ভবানীপুরে নিজের জয় শুভেন্দু উৎসর্গ করলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্বের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা ৩০০ বিজেপি কর্মীর প্রতি’।
নিজের আসন ভবানীপুরকে ‘বড়বোন’ এবং নন্দীগ্রামকে ‘মেজবোন’ বলে সম্বোধন করেন মমতা। ‘মেজবোনের’ কাছে পাঁচ বছর আগেই হেরেছিলেন। সে বারও হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এ বার ‘বড়বোন’ ভবানীপুরেও হারলেন তিনি। এ বারও হারালেন সেই শুভেন্দুই। গত বারের চেয়ে আরও বড় ব্যবধানে। নন্দীগ্রাম আসনে পাঁচ বছর আগে ১৯৫৬ ভোটে মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এ বার জয়ের ব্যবধান আরও বাড়ালেন শুভেন্দু— ১৫১০৫ ভোটে। নিজের পাড়ার বিধানসভায় হেরে গেলেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যা সম্ভবত মমতার রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে বড় অন্ধকারতম অধ্যায় হয়ে থাকল। পাশাপাশি পরপর দু'বার মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়ে বিজেপিতে 'লেজেন্ড' হয়ে গেলেন শুভেন্দু। জয়ী হওয়ার পর বিজেপি প্রার্থী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। অপরদিকে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করে বলেছেন, “বিজেপি ভোট লুঠ করেছে। আমায় মারা হয়েছে। জোর করে হারানো হয়েছে। আমি আবার ফিরে আসব।”

বেসরকারি হিসেবে দেখাচ্ছে ২০৮ আসনে জয়ী হচ্ছে বিজেপি। টিএমসি পাচ্ছে ৭৯ টি আসন। বেশিরভাগ আসনেই রয়েছে জয়ের খবর, তবে কটকটি আসনে এগিয়ে রয়েছে দুটি দলই। আর আমার এই লেখা অব্দি কমিশনের সাইট বলছে, বিজেপি পেয়েছে ২০৬ টি আসন, তার মধ্যে জয়ী হয়েছে ২০১ টি আসনে, এগিয়ে রয়েছে ৫ টি আসনে। টিএমসি পেয়েছে ৮১ টি আসন। তার মধ্যে জয়ী হয়েছে ৬৯ টি আসনে এবং এগিয়ে রয়েছে ১২ টি আসনে। কংগ্রেস পেয়েছে ২টি আসন। হুমায়ন কবিরের দল ২ টি আসন পেয়েছে, দুটিতেই উনি নিজেই জিতেছেন। বামজোট পেয়েছে ২টি আসন। একটি বামফ্রন্ট এবং অন্যটি আইএসএফ।
বিজেপিকে ২০০ পার করাতে বড় ভূমিকা নিল গোটা উত্তরবঙ্গ। পাহাড় থেকে ডুয়ার্স হয়ে কোচবিহার—কার্যত সুনামি বইয়ে দিয়েছে বিজেপি। ভালো ফল করেছে মালদা ও দুই দিনাজপুরেও। পাহাড়-ডুয়ার্স থেকে কার্যত খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তৃণমূলকে। উত্তর দিনাজপুর এবং মালদা থেকে কিছু আসন পেয়েছে তৃণমূল, আর কোচবিহারে সিতাই ধরে রাখতে পেরেছে জোড়াফুল শিবির। দার্জিলিং, কার্শিয়াং, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া ও শিলিগুড়ি। পাঁচটি আসনেই জিতেছে বিজেপি। জলপাইগুড়িতে রয়েছে ৭টি আসন, সেখানেও সব আসনে জয়ী বিজেপি। কোচবিহারের ৯টি আসনের মধ্যে একমাত্র সিতাই ছাড়া বাকি সব বিজেপির দখলে। আলিপুরদুয়ারে ৫টি বিধানসভা আসনের মধ্যে সবক’টিতেই হয় জয়ী হয়েছে বিজেপি। উত্তর দিনাজপুরে রয়েছে ৯টি আসন। এই জেলায় তুলনায় ভালো ফল করেছে তৃণমূল। ৯টির মধ্যে ৫টিতে (চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া, ইটাহার) জয়ী হয়েছে তৃণমূল। অন্যদিকে বাকি চারটি (করণদিঘি, হেমতাবাদ, কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ) আসনে জিতেছে বিজেপি। দক্ষিণ দিনাজপুরে ৬টি বিধানসভা কেন্দ্র। এখানে বালুরঘাট, তপন, গঙ্গারামপুর, কুশমন্ডি বিজেপির দখলে গিয়েছে। অন্যদিকে কুমারগঞ্জ ও হরিরামপুরে তৃণমূল জিতেছে। মালদায় ১২টির মধ্যে ৬টি আসন জিতেছে বিজেপি (মালদা, মানিকচক, ইংরেজবাজার, বৈষ্ণবনগর, হবিবপুর ও গাজোল)। বাকি ৬টি আসনে (চাঁচল, মোথাবাড়ি, সুজাপুর, মালতিপুর, রতুয়া, হরিশ্চন্দ্রপুর) জয়ী হয়েছে তৃণমূল। আগের সব রেজাল্ট ছাপিয়ে এ বার উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে ৪০টি আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি।
এবারে প্রচুর মন্ত্রী নিজেদের জয় ধরে রাখতে পারেননি। মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদায়ী তৃণমূল সরকারের মন্ত্রিসভার দুই উল্লেখযোগ্য মুখ৷ শশী পাঁজা এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য হেরে গেলেন। হেরে গেলেন ব্রাত্য বসু, সুজিত বসু, রাজ চক্রবর্তী, মাংস ভূঁইয়া, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী, দেবাশিস কুমার, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, অরূপ বিশ্বাস, রত্না চট্টোপাধ্যায়, পরেশচন্দ্র অধিকারী, উদয়ন গুহ, অর্পিতা ঘোষ, বিরবাহা হাঁসদা, গৌতম দেব সহ আরও হেভিওয়েট নেতা। যদিও ফিরহাদ হাকিম, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় নিজেদের আসন ধরে রাখতে পেরেছেন। হেরে গিয়েছেন কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী অধীর রঞ্জন চৌধুরী।
বাংলায় বিজেপির বিপুল জয়ের পরেই রাজধানীতে বিজেপির সদর দফতরে বক্তব্য রাখলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলা জয়কে গুরুত্ব দিয়ে তিনি একেবারে বাঙালি বাবু হয়ে এলেন দফতরে। সাদা রঙের পাঞ্জাবি, সঙ্গে ঘিয়ে রঙের তসর সিল্কের কোঁচা দেওয়া ধুতি। কোঁচাটা আবার গোঁজা পাঞ্জাবির পকেটে। গলায় ছিল উত্তরীয়। সেখানে বাজছিল বাংলায় করা বিজেপির সেই ক্যাম্পেইনের গান! উচ্ছসিত বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এতদিনের অধরা রাজ্য ধরা দিল তাদের মসনদে। স্বভাবতই যথেষ্ট খুশি দেখাচ্ছিল প্রত্যেককে। নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে বলেন, ‘আজ থেকে বাংলার ভবিষ্যতের এমন একটি যাত্রা শুরু হচ্ছে যেখানে বিকাশ, অটুট বিশ্বাস এবং নতুন উদ্যম পায়ে পায়ে চলবে। আমি আজ সব বাংলাবাসীকে ভরসা দিচ্ছি, বাংলার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য বিজেপি দিন রাত এক করে দেবে।’ তিনি বললেন, ‘এতদিনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মা শান্তি পেল।' অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আসন্ন রবীন্দ্রজয়ন্তীর উল্লেখ করলেন মোদী। সম্ভবত সেদিনিই হতে চলেছে নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান!
সোমবার, একদিকে যখন ইভিএমের ফল রাজ্যের পালাবদলকে ইঙ্গিত করছে, ঠিক তখনই প্রশাসনের অন্দরে এক নজিরবিহীন নির্দেশিকা জারি করল নবান্ন। সোমবার রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা এক কড়া নির্দেশে জানিয়েছেন, রাজ্যের সরকারি দফতরগুলি থেকে যেন কোনও নথি বা একটি ফাইলও সরানো বা নষ্ট করা না হয়। কোনও ফাইল থেকে যেন কোনও তথ্য টুকেও না রাখা হয়। এই বিষয়গুলি রাজ্যের সব দফতরের সচিব এবং প্রধানদের নিশ্চিত করতে বলেছেন তিনি। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে এই বার্তা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে। রাজ্যের সব সরকারি দফতরের সচিব, বিভাগীয় প্রধানের পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজি, আইজি, সকল বিভাগীয় কমিশনার, কলকাতা পুলিশের কমিশনার, জেলাশাসকদেরও নির্দেশিকাটি পাঠানো হয়েছে। এমনকী রাজ্যপালের সচিবকেও বিষয়টি সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। একদিকে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে নবান্ন ঘিরে ফেলে বাহ্যিক নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই নির্দেশিকা জারি করে প্রশাসনিক আধিকারিকদের আইনিভাবে দায়বদ্ধ করা হল।
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পরে যাতে ভোট পরবর্তী হিংসা না ছড়ায় তার জন্য ৫০০ কোম্পানি বাহিনী রাজ্যে থাকবে বলে জানালেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল। এ দিন বিকেলে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যের সিইও জানান, ৬ তারিখ পর্যন্ত মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট থাকছে। এর পরে নতুন প্রশাসনের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হবে। আগামিকাল, মঙ্গলবার আসছেন নির্বাচন কমিশনের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি এস বি যোশী ও সেক্রেটারি সুজিত কুমার মিশ্র। আগামিকালই ২০২৬ সালের রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে। আগামী বুধবার সকালে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল এবং প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এসবি যোশী রাজ্যপাল আরএন রবির কাছে সেই তালিকা নিয়ে উপস্থিত হবেন। এরপর গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশিত হবে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিক সম্মেলন করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিকেল ৪টেয় কালীঘাটে হবে এই সাংবাদিক সম্মেলন।
বছরের প্রথম অর্ধে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল, পুদুচেরি, অসমে ভোট হয়েছে ৷ উত্তর-পূর্বের অসম ছাড়া বাকি চারটি রাজ্যেই বদলের ঝোড়ো হাওয়া বইছে এবারে। অসমে তৃতীয়বারের জন্য বিজেপি সরকার এল। কেরলে বামপন্থী জোটের বিদায় নিশ্চিত করেছে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউডিএফ জোট ৷ তামিলনাড়ুতে বিজয় ঝড়ে ডিএমকে-এআইডিএমকে শাসক-বিরোধী বাইনারি তছনছ হয়ে গিয়েছে ৷ পুদুচেরিতে কংগ্রেস বিদায় নিয়েছে ৷ জয়ী বিজেপি সমর্থিত অল ইন্ডিয়া এনআর কংগ্রেস (এআইএনআরসি) ৷









Comments