বেশ গালভরা বাজেট পেশ করল রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার
- The Conveyor
- 3 hours ago
- 4 min read

কলকাতা, ২২ জুন, ২০২৬: রাজ্যের বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট। শুরুই করল ছক্কা হাঁকিয়ে। প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা এবং গতি আনতে কলকাতা, সুন্দরবন সহ নতুন পাঁচটি জেলার ঘোষণা করা হল। উত্তরবঙ্গে হবে আইআইটি এবং আইআইএম। মেট্রো পাবে শিলিগুড়ি, আসানসোল এবং দুর্গাপুর। কল্যাণীতে নতুন বিমানবন্দর ঘোষণার পাশাপাশি বিমানবন্দর পাবে পুরুলিয়া, মালদহ এবং বালুরঘাট। এক লক্ষ সরকারি কর্মী নিয়োগ করা হবে, যার মধ্যে অর্ধেক নিয়োগ হবে শিক্ষাক্ষেত্রে। সঙ্গে ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ থাকছে। সরকারি কর্মচারীদের ২০% ডিএ ঘোষণা করা হল। বিধায়ক তহবিলে বার্ষিক টাকার পরিমাণ ৭০ লক্ষ থেকে বাড়িয়ে এক কোটি টাকা করা হচ্ছে। যাতায়াতের সুবিধার্থে হবে চিংড়িঘাটা থেকে নিউটাউন এলিভেটেড করিডর।
নতুন জেলা হবে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগ। এর পাশাপাশি কাঁথিতে একটি নতুন পুলিশ জেলা গঠনের কথা বলা হয়েছে। ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুরে তৈরি করা হবে নতুন মহকুমা। নতুন পুরসভা হবে দার্জিলিঙের শিবমন্দির, মালদহের গাজোল, চাঁচল, পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা, হাওড়ার বাগনান, পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট, হুগলির কামারপুকুর, উত্তর দিনাজপুরের টুঙ্গিদিঘি এবং আলিপুরদুয়ারের জয়গাঁতে। মালদহের মানিকচক, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতার মতো কয়েকটি জায়গায় নতুন দমকলকেন্দ্র তৈরি করার কথাও জানানো হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, জেলায় যে ভাবে প্রশাসনিক কাজকর্ম চলে, এ বার কলকাতাতেও সেই ভাবেই চলবে। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্য উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত বলেন, “সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে কলকাতার মানুষ উপকৃতই হবেন।”
একসঙ্গে চারটি নতুন বিমানবন্দর তৈরি করার কথা ঘোষণা করা হল রাজ্য বাজেটে। পাশাপাশি কোচবিহার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে বলে জানিয়ে দিলেন তিনি। কল্যাণীর কাছে একটি ‘গ্রিনফিল্ড’ বিমানবন্দর তৈরি করতে ১০০০-১৫০০ একর জমি শনাক্ত করবে সরকার। পাশাপাশি, কেন্দ্রের উড়ান প্রকল্পের আওতায় পুরুলিয়া, বালুরঘাট এবং মালদহেও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও নিরাপত্তা এবং কৌশলগত কারণে হাসিমারা ও কলাইকুণ্ডায় জমি বরাদ্দ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত উল্লেখ করলেন, আঞ্চলিক পর্যটন বাড়াতে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও পোক্ত হবে। কলকাতায় বায়ুসেনাকে ৩৭ একর জমি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে কেন্দ্রের পিএম- শ্রী প্রকল্প বাস্তবায়িত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাছাই করা স্কুলগুলির গুণমান, পরিকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে মডেল প্রতিষ্ঠানো পরিণত করার প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। এর জন্য ২১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে বাজেটে। উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি এবং একটি আইআইএম স্থাপন করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একাধিক নবোদয় বিদ্যালয় তৈরির জন্য জমি দেবে রাজ্য। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় দু’টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে। আগামী পাঁচ বছরে ভারত সরকারের ১০০০ কোটি টাকা সাহায্য এবং রাজ্যের তরফে ২০০ কোটি টাকা দেওয়া হবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ইনস্টিটিউট অফ এক্সেলেন্স উন্নীত করার জন্য। আইআইটি, জেইই, নিট, ক্যাট, সিএ এবং সিভিল সার্ভিসের মতো পরীক্ষার প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিটি জেলায় স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন বসানো হবে। রাজ্যে একটি নতুন স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিলের উপকরণের খরচের জন্য পড়ুয়াপ্রতি ৬.৭৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে বাজেটে। কলকাতা পুরসভা এলাকায় থাকা স্কুলগুলির জন্য ইসকনের সহযোগিতায় মিড-ডে মিল দেওয়ার ব্যবস্থা হবে।
এক লপ্তে ২০ শতাংশ ডিএ বাড়ল রাজ্যের সরকারি কর্মী, আধা সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের। যাঁরা পেনশন পান, তাঁরাও অতিরিক্ত ২০ শতাংশ ডিআর (ডিয়ারনেস রিলিফ) পাবেন। চলতি বছরের অক্টোবর থেকে বর্ধিত এই ডিএ পাবেন সরকারি কর্মীরা। এই ঘোষণার পরে রাজ্যের সরকারি কর্মীদের ডিএ-র হার হলো ৩৮ শতাংশ। একই সঙ্গে বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যের কর্মচারীদের মধ্যে ডিএ-র পার্থক্য রইল ২২ শতাংশ। এ দিন বাজেট বৈঠক শেষে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া এরিয়ারের মধ্যে আগের সরকার কিছু দিয়ে গিয়েছিল, বিজেপি সরকারে আসার পরে কিছু দিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘২০১৬ থেকে ২০১৯-এর কার্যত ক্লিয়ার। ২০০৮-২০১৫ বাকি আছে। ফান্ড অ্যাভেলেবলিটির উপরে সেটাও দিয়ে দেবো। কর্মচারীরা নিশ্চিন্তে থাকুন।' এছাড়াও মাসিক সাম্মানিক ৫০০০ টাকা এবং সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশদের এবং হোমগার্ডদের ২০০০ টাকা বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী। স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক কন্ডাক্টরদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে মাসে ১৬ হাজার টাকা করা হবে।
বাজেটে যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা হবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে। রাজ্যের উপকূলীয় বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি এবং শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পকে গেমচেঞ্জার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রচুর কর্মসংস্থানও হবে। বীরভূমে ময়ূরাক্ষী নদীর উপর চার লেনের সেতু হবে। বাজেটের গেমচেঞ্জার হিসেবে দুর্গাপুর, আসানসোল ও শিলিগুড়িতে মেট্রো রেল পরিষেবা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হল। কলকাতার বাইরে এই তিন শহরে মেট্রো চালু হলে নগর পরিবহণ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে মনে করছেন পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা। জরুরি পরিষেবার জন্য প্রতিটি থানায় একটি করে গাড়ি চালু করা হবে। তাতে বরাদ্দ হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। দুর্গাপুজোকে ঘিরে পর্যটন ব্র্যান্ডিং অভিযান চালানো হবে।
অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এখন থেকে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনও মদের দোকানের নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া হবে না। কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রে এই লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দূরত্ব হবে ৫০০ মিটার। এছাড়াও ব্যবসাকে সিন্ডিকেট চার্জ এবং অন্য বেআইনি অর্থ আদায় থেকে রক্ষা করার আইন আনা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
ক্রীড়া সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে রাজ্যে 'খেলো ইন্ডিয়া' কার্যক্রম শুরু হবে। রাজ্যে প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে। উত্তরবঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং একটি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য মোট ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে। সরকারের নিয়োগকারী সংস্থাকে ইউপিএসসি-র ধাঁচে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। বাজেটে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, এতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, নিয়োগ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে। বাজেটে জানানো হয়েছে, সরকারি এবং সরকার পোষিত কলেজের যে পড়ুয়ারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের এককালীন ৩০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। এ জন্য বাজেটে ৩০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ইতিমধ্যে ৫ বছর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ বার এই বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ছাড়ের সুবিধা পরবর্তী দু’বছরের জন্য বহাল থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন স্পষ্ট করে দেন, কোন পথে চলবে রাজ্য। তাঁর কথায়, ‘‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দেখানো পথেই বাংলা চলবে। বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম, ইস্কনের পথে বাংলা চলবে। সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুতি ঘটবে না।’’ মুখ্যমন্ত্রী আরও এক বার জানান, অল্প দিনের মধ্যে ‘সুন্দর, ইনক্লুসিভ’ বাজেট পেশ করেছে তাঁর সরকার। তাঁর কথায়, ‘‘অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কথা বলা নেই। অতিরিক্ত ঘাটতিও নেই। সামান্য এক-দু’ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।’’ বাজেট নিয়ে কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘এখানে খরচের কথা বলা হয়েছে, টাকা কোথা থেকে আসবে, সরকারের আয় কী, তা পুস্তিকায় স্পষ্ট নয়। ব্যয় করছে সরকার, আয় কোথা থেকে! কেন্দ্রীয় সরকার নির্ভর বাজেট। ভাল-মন্দ কোনওটাই বলছি না।’’ কুণাল জানিয়েছেন, নতুন সরকারকে তাঁরা সময় দিতে চান।









Comments