ফ্লাইদুবাই- এর ককপিটে পরিকল্পিত 'সন্ত্রাসবাদী হামলা' ঘটেছে, জানাল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কো- পাইলটকে ঘিরে বাড়ছে রহস্য

৩ অক্টোবর ২০২৬: দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ‘ফ্লাইদুবাই ১০৭৩’ বিমানের ককপিটে চালানো তাণ্ডব কোনও সাধারণ সংঘাত ছিল না, বরং তা একটি পরিকল্পিত 'সন্ত্রাসবাদী হামলা' ছিল বলে শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। ওমানি কো-পাইলট বিমানটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে বিরাট বিপর্যয় ঘটানোর লক্ষ্যে ককপিটে থাকা জরুরি 'ক্র্যাশ অ্যাক্স' বা বিশেষ কুড়ুল দিয়ে ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছারের ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ চালিয়েছিল।
ককপিটে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছারের উপর হামলা চালানো ওমানি কো-পাইলটকে ঘিরে একের পর এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য সামনে আসছে। ফ্লাইদুবাই-কাণ্ডে ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরের উপর হামলার ঘটনায় ধৃত সহকারী বিমানচালকের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে তদন্তে নেমেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সেখানেই উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাই বিমানে মাঝ আকাশে ভয়াবহ ঘটনার পর অভিযুক্ত ওমানি কোপাইলট হামাম আল হামামির নামের একটি লিঙ্কডইন প্রোফাইলে দুটি পোস্ট দেখা গিয়েছিল বলে দাবি করেছে একাধিক সংবাদমাধ্যম। ওই পোস্টে ককপিটের ছবি ও ভিডিওর পাশাপাশি আল কায়দার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ছবি ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ায় আল কায়দা জঙ্গিদের ছবি, চরম উগ্র মৌলবাদী ওয়েবসাইটে অবাধ ঘোরাফেরা, কট্টর নারীবিদ্বেষী মানসিকতা এবং বিমান সংস্থা থেকে শাস্তিমূলক বদলি রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে হামাম আল-হাম্মামির বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত ওই কো-পাইলটের পরিচয় প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। জানা গিয়েছে, তাঁর নাম হামাম আল-হামামি। ৩০ সেপ্টেম্বর মাঝআকাশে তিনি ভারতীয় কাপ্তানের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং বিমানটিকে আছড়ে ফেলে ১৫০ জনেরও বেশি যাত্রীর প্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আপাতত তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে তদন্তকারীদের হেফাজতে রয়েছেন। ফ্লাইদুবাই-এ যোগ দেওয়ার প্রায় আট মাস আগে, আল-হামামি ওমানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা 'ওমান এয়ার' এবং মরক্কোর জাতীয় বিমান সংস্থা 'রয়্যাল এয়ার মারোক' -এ কাজ করেছিলেন। ওমান এয়ারে কাজ করার সময়ই তাঁর উগ্র মৌলবাদী ধ্যানধারণা প্রথম নজর কাড়ে কর্তৃপক্ষের। একাধিক কট্টর ও উগ্রপন্থী ওয়েবসাইট সার্চ করার অভিযোগে ওমান এয়ারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসংস্থা তাঁর ওপর নজরদারি শুরু করে। সুরক্ষাজনিত ঝুঁকির কারণে তাঁকে বিমান ওড়ানোর কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং টেবিল জব বা ডেস্ক ডিউটিতে বদলি করা হয়। কিন্তু বিমান ওড়ানোর কাজ না পেয়ে এবং অফিস ডিউটি পছন্দ না হওয়ায় ২০২৫ সাল নাগাদ তিনি ওমান এয়ার ছেড়ে দেন। আট মাস আগে (২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ) ফ্লাইদুবাই-এ যোগ দেন। তাঁর ফ্লাইদুবাইয়ের চাকরি পাওয়ার বিষয়টি বেশ রহস্যবৃত। এ ব্যাপারে বিশেষ কারও সুপারিশ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না কোনও ইহুদি গণমাধ্যম। সহকর্মীরা জানিয়েছেন, আল-হামামি ছিলেন চরম ধর্মীয় গোঁড়া, সবসময় প্রার্থনা করতেন এবং মহিলাদের সঙ্গে হাত পর্যন্ত মেলাতেন না। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বিষয়টি নাকি এড়িয়ে যেতেন ধৃত অভিযুক্ত। ধৃতের বাবা ওমানের বাসিন্দা এবং মা সিরীয়। তবে, আমিরশাহিতে জন্ম হয় তাঁর। জীবনের বেশির ভাগ সময় সেখানেই কাটান তিনি। এর জেরে আনুষ্ঠানিক ভাবে হামামের নাগরিকত্ব স্বীকার করেনি ওমান।
তাঁর বন্ধ হয়ে যাওয়া লিঙ্কডইন প্রোফাইলে ঘটনার দিন অর্থাৎ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঠিক দুটি পোস্ট প্রকাশিত হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, মাঝআকাশে বিমান ধ্বংস করার আগেই পোস্টগুলি সময়ের হিসেবে শিডিউল করে রাখা হয়েছিল। যা দেখে চমকে উঠেছেন সিএনএন-এর সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞরা। প্রথম পোস্টে একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের ককপিটের ভিতরের বেশ কিছু ভিডিও ছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। এর একটি অংশে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা ইজরায়েলি বিমান সংস্থা এল আলের একটি বিমানকে বিশেষ ভাবে দেখানো হয়। দ্বিতীয় পোস্টটিতেও ছিল ধর্মীয় এবং প্রতীকী উপাদান। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি একটি ছবিতে মক্কা, মদিনা এবং জেরুজালেমের ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিকে একসঙ্গে দেখানো হয়েছিল। ছবির সঙ্গে এমন একটি কবিতা ছিল, যাতে অপমান মেনে না নেওয়া, মৃত্যুকে ভয় না পাওয়া এবং মর্যাদা রক্ষার মতো বার্তার উল্লেখ ছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। একই সময় একই ধরনের পোস্ট হামাম আল হামামির নাম ও ছবি থাকা একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও দেখা যায়। যদিও পোস্টগুলি পরে সরিয়ে ফেলা হয়। সেই ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটিও মুছে ফেলা হয়েছে।
সমাজমাধ্যমে কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়দার সন্ত্রাসীদের বহু ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। তা ছাড়া মৌলবাদী ওয়েবসাইটেও নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল তাঁর। পাশাপাশি, হামামের ‘বিতর্কিত’ কর্মজীবনও আতশকাচের তলায় রেখেছেন তদন্তকারীরা।









Comments