চিকিৎসার জন্য দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়া হল গোটা বিশ্বে প্রশংসিত স্মিত মচ্ছরকে, দেওয়া হল ‘বিশিষ্ট গুজরাত গরিমা’ সম্মান

১ অক্টোবর ২০২৬: চিকিৎসার জন্য দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়া হল ফ্লাইদুবাইয়ের ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরকে। সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলবে। ককপিটে সহ-পাইলটের ছুরির কোপে গুরুতর আহত হন স্মিত। তাঁর মাথা, হাতে এবং শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ছুরি দিয়ে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। দুবাই থেকে ইজরায়েলগামী 'ফ্লাইদুবাই এফজেড ১০৭৩' বিমানে যাত্রা শুরুর প্রায় দুই ঘণ্টা পর আচমকাই শুরু হয় বিপদ। ককপিটে হামলার শিকার হয়ে রক্তাক্ত হন পাইলট। যে কোনও মুহূর্তে ঘটে যেতে পারত ভয়াবহ দুর্ঘটনা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার, যার জেরে প্রাণে বাঁচলেন বিমানে থাকা শতাধিক যাত্রী। তাঁর সাহসিকতায় এড়ানো গেল ৯/১১-এর মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা।
গুজরাতের এই সন্তানের বাহাদুরি শুধু রাজ্যই নয়, গোটা দেশ এমনকি বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। স্মিতের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মূর্মূ। প্রশংসায় মুখরিত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সাহসিকার জন্য গুজরাত সরকার বৃহস্পতিবার পাইলট স্মিতকে ‘বিশিষ্ট গুজরাত গরিমা’ সম্মান দিয়েছে। স্মিত মচ্ছর এখন সারা বিশ্বে কার্যত ‘সুপারহিরো’। তবে তিনি ছাড়াও ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073-এর সেই ভয়াবহ ঘটনায় কয়েকজন যাত্রীও অসাধারণ ভূমিকা নেন। কেউ ককপিটে ঢুকে ওমানের বাসিন্দা অভিযুক্ত কো-পাইলটকে কাবু করেন, আবার একজন চিকিৎসক যাত্রী রক্তাক্ত ক্যাপ্টেনের তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা শুরু করেন।
বিমানে যাত্রা শুরুর প্রায় দুই ঘণ্টা পর আচমকাই বিপদ শুরু হয়। বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট নীচে নেমে যায়। একই সঙ্গে সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরতে শুরু করে। পরিস্থিতি যে অত্যন্ত গুরুতর, তা বুঝতে পারেন ক্যাপ্টেন স্মিত। ততক্ষণে হামলার শিকার হয়েও অকুতোভয় মচ্ছার জরুরি বিপদসংকেত ‘৭৭০০’ (সাধারণ জরুরি অবস্থা) এবং ‘৭৫০০’ (হাইজ্যাকের সঙ্কেত) পাঠিয়ে দেন। এর পরপরই ইজরায়েল সরকার সতর্ক হয়ে তাদের যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে দেয়। ৯/১১-এর পর বিমানের ককপিটের দরজা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাইরে থেকে সাধারণভাবে তা খোলা না যায়। কিন্তু সংজ্ঞা হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে গুরুতর আহত স্মিত ভিতরের সুইচ টিপে ককপিটের দরজা খুলে দেন। দরজা খুলতেই কয়েকজন যাত্রী দ্রুত ভিতরে ঢুকে পড়েন। তাঁরা দেখেন, প্রধান পাইলট রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছেন। অন্যদিকে কো-পাইলট ড্যাশবোর্ড ভেঙে বিমানটিকে ক্র্যাশ করানোর চেষ্টা করছে। যাত্রীরা দ্রুত তাঁকে কাবু করে ফেলেন।
চিৎকারের আওয়াজ পেয়ে যাত্রী আসনে থাকা দু'জন অফ ডিউটি পাইলট এবং একজন ডেন্টিস্ট ককপিটের ভিতরে ঢোকেন।ঘটনায় উঠে আসছে যাত্রী শোটা মুসায়েভের নাম। পেশায় তিনি একজন ডেনটিস্ট বা দন্ত চিকিৎসক। প্রথমে মুসায়েভই ককপিটের দিকে ছুটে যান। তিনি বলেন, ‘ক্যাপ্টেন স্মিতের অবস্থা তখন খুবই খারাপ। মাথা ও হাতে গুরুতর আঘাত ছিল এবং প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিল’। তিনি দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, রক্তাক্ত অবস্থায়ও বিমানের মেঝেতে শুয়ে স্মিত মচ্ছর যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। জভিকা মানেস নামে অন্য এক যাত্রীও ককপিটে পৌঁছে যান স্মিত মচ্ছরকে বাঁচাতে। ঢুকেই পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হেডফোনের তার দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে বেঁধে দিয়েছিলেন। পেশায় ব্যাঙ্ক লিউমির আন্ডাররাইটিং কোম্পানির CEO তিনি। বিপদের মুহূর্তে তিনিই প্রথম যাত্রী, যিনি ককপিটে পৌঁছে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেছিলেন। ইনশিওরেন্স এজেন্সির মালিক আসাফ রাজুয়ানও ককপিটে গিয়েছিলেন সেই মুহূর্তে। ককপিটে দৌড়ে ঢুকে রাজুয়ান দেখতে পান হামলা হচ্ছে। দ্রুত অভিযুক্ত কো-পাইলটকে কাবু করেন তিনি। রাজুয়ানের দাবি, তাঁরা প্রায় ৫০ মিনিট অভিযুক্তকে আটকে রেখেছিলেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুকে ল্যান্ড না হয়েছে। ইয়ানিভ হায়ুন পেশায় একজন প্লাম্বার। হায়ুন বলেন, ককপিটের ভিতরে ঢুকে তিনি দেখেন, অভিযুক্ত কো-পাইলট ফ্লাইটের কন্ট্রোল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর ক্যাপ্টেন স্মিত আহত অবস্থায় নীচে পড়ে রয়েছেন। হায়ুন দ্রুত অভিযুক্তকে ককপিটের সিট থেকে সরিয়ে দেন। এই চারজনেরও ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিমানটি রক্ষা করার জন্য।
ফ্লাইদুবাই বিমান কাণ্ডে শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা বিশ্বে। ইতিমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সৌদি আরব। ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরের উপর হামলায় অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে গ্রেফতারও করেছে তারা। এর পরে সম্ভবত ওই সহ-পাইলটকে নিয়ে যাওয়া হবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে। তারাও তদন্ত করবে। আর সেই তদন্তে যোগ দিতে চায় ইজরায়েলও। এমনটাই জানিয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
দন্ত চিকিৎসকের বিবরণ অনুযায়ী পুরো ককপিট রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। মাথার পাশাপাশি স্মিত মচ্ছারের দুই হাত এমনভাবে কোপানো হয়েছিল যে, হাত দুটো যেন শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। মাথা ও হাত থেকে অনবরত গলগল করে রক্ত বের হচ্ছিল। বিমানে উপস্থিত একমাত্র চিকিৎসক হিসেবে মুসায়েভ দ্রুত স্মিতের প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেন এবং কোনওমতে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। মুসায়েভকে স্মিত বলেছেন, সহ-পাইলট তাঁকে মারাত্মক গালিগালাজ করে এই হামলা চালিয়েছে। চরম রক্তক্ষরণের কারণে বারবার অচৈতন্য হওয়ার মতো অবস্থা হলেও অবতরণের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং লড়াই চালিয়ে যান।
এদিকে ঘটনায় কূটনৈতিক টানাপোড়েন সামনে এসেছে। এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, ফ্লাইদুবাইয়ের ওই বিমানটিতে থাকা ইজরায়েলি যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইজরায়েলের পক্ষ থেকে বিশেষ সামরিক বিমান পাঠানোর আবেদন জানানো হয়েছিল রিয়াধের কাছে। কিন্তু সেই আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে সৌদি আরব। দুটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সূত্র বুধবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে তাঁরা। উল্লেখ্য, সৌদি আরব ও ইজরায়েলের মধ্যে কোনও ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। রিয়াধ সাফ জানিয়ে দেয়, তারা ইজরায়েলি সামরিক বিমানকে তাদের আকাশসীমা বা বিমানবন্দরে অবতরণের অনুমতি দেবে না। বিমান সংস্থার পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে যে, যাত্রীদের পরবর্তী সময়ে অন্য একটি ফ্লাইদুবাই বিমানেই নিজেদের গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই বিষয়ে সৌদি সরকার এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। সার্বিকভাবে, ফ্লাইদুবাই বিমানের এই নাটকীয় জরুরি অবতরণ ও সৌদির বিমান নামানোর অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ নতুন করে চড়িয়েছে।
ইজরায়েলি আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত পাইলট ওমানের নাগরিক। তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে কর্মরত। যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, তাই তাঁর নাম, বয়স, আগে তিনি কোথায় কাজ করতেন বা ফ্লাইট চালোনোর ক্ষেত্রে তাঁর কী অভিজ্ঞতা রয়েছে সে বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে কিছু জানানো হয়নি। তবে সূত্রের খবর, তিনি এক বছরেরও কম সময় ধরে ফ্লাইদুবাইয়ে কাজ করছিলেন। ওমানের সঙ্গে ইজরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফলে ওই নাগরিক কী ভাবে তেল আভিভগামী বিমানের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পেলেন—তা খতিয়ে দেখছে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ। তাঁর অন্য কোনও দেশের পাসপোর্ট ছিল কি না, সেই সম্ভাবনা নিয়েও তদন্ত চলছে। এই ওমানি পাইলটকে ঘিরে উঠছে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ। তাঁর সঙ্গেই কর্মরত ফ্লাইদুবাইয়ের এক কর্মী ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ওই কো-পাইলট মহিলাদের সঙ্গে হাত মেলাতেন না। তাঁর ধর্মীয় আচরণও ছিল সন্দেহজনক। হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল বা এর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী সংস্থার কোনও যোগও রয়েছে কিনা, সেই সব নিয়েও তদন্ত চলছে।
বৃহস্পতিবার টাইমস অফ ইজরায়েল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সৌদির তাবুক শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল স্মিতের। সেখানে তাঁর অস্ত্রোপাচার হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। সূত্রের খবর, স্মিতের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে চিকিৎসার জন্য তাঁকে দুবাইয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্মিতের পরিবার প্রথমে সৌদিতে পৌঁছোয়। সেখান থেকে দুবাইয়ে গিয়েছে।









Comments