top of page

'সহজ কথা' জটিল হয়ে গেল হঠাৎ করেই

স্বর্ণালী গোস্বামী

29 Mar 2026

বুঝতে শুরু করেছিলাম কতটা মাটির কাছাকাছি ছিলেন তিনি। প্রথম সারির বাঙালি অভিনেতা হয়েও মধ্যবিত্ত আদর্শ তাঁকে ভিড়ে মিশে যেতে দেয়নি

আমার কাছে 'সহজ কথা' জটিল হয়ে গেল হঠাৎ করেই। অভিনেতা হিসেবে সাধারণ মানুষের মন জয় করেছিলেন প্রথম ছবি থেকেই। 'চিরদিনই তুমি যে আমার' রিলিজ করার সঙ্গে সঙ্গেই সুপার ডুপার হিট। আমারও ভালো লাগত অবশ্যই তাঁর অভিনয়। অসাধারণ অভিনেতা। চরিত্রাভিনেতা বলাই হয়ত ভালো হবে। যে কোনও চরিত্রে সাবলীল ছিলেন। কিন্তু আমার বিশেষ কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন গত ৭-৮ মাস ধরে। পডকাস্টের দৌলতে। বিভিন্ন রকমের পডকাস্ট দেখা আমার এখন নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, বর্তমান সময়ে। ভালো সময় কাটানোর মাধ্যম এই পডকাস্টগুলো। তাই 'সহজ কথা' প্রথম দেখাতেই খুব কাছের হয়ে উঠেছিল। সাবস্ক্রাইব তো করেছিলাম অবশ্যই। রাহুলের সহজভাবে বলা গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন, অনুষ্ঠানটির অসাধারণ বুনন, নির্ভেজাল হাসি, বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, দৃঢ় মানসিকতা- সব ফুটে উঠত ওই পডকাস্টের মাধ্যমে। চিনতে শুরু করেছিলাম মানুষ রাহুলকে। বুঝতে শুরু করেছিলাম কতটা মাটির কাছাকাছি ছিলেন তিনি। প্রথম সারির বাঙালি অভিনেতা হয়েও মধ্যবিত্ত আদর্শ তাঁকে ভিড়ে মিশে যেতে দেয়নি। বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন, সেখান থেকে তাঁকে টলাতে পারেনি কেউই। অথচ দলের কর্মী কিন্তু ছিলেন না। ছিলেন ওই মতাদর্শে বিশ্বাসী।

এই আকস্মিকতার ঘোর কাটতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল আমারও। সকলের মতো। মনে হচ্ছিল খুব চেনা কোনও মানুষকে হারালাম। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ অভিনেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই শোকস্তব্ধ টলিপাড়া। কান্নাকাটি করছেন অভিনেতা- অভিনেত্রীরা। রবিবার ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং করছিলেন ৪৩ বছরের অভিনেতা। দিঘার তালসারি সৈকতে গিয়েছিল সিরিয়ালের কলাকুশলীরা। ছিলেন অভিনেতা নীল, মধুমিতা চক্রবর্তী, ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহানা-সহ গোটা টিম। ছিলেন রাহুলও। কলকাতায় ছেলে সহজকে নিয়ে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা। সূত্রের খবর, রবিবার সিরিয়ালের শ্যুটিং চলছিল সকাল থেকেই। স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গিয়েছে তালসারিতে শুটিংয়ের মাঝে বোট উল্টে যায়, তার সঙ্গে সিরিয়ালের এক সহ-অভিনেত্রীও ছিলেন। তাঁদের দু’জনকে উদ্ধার করা হয়। মৃত্যু হয় রাহুলের। ওই অভিনেত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, বেশ কিছু ক্ষণ জলের তলায় ছিলেন তিনি। কেন অত পরে উদ্ধার করা হল তাঁকে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সন্ধে ছ’টা নাগাদ দিঘা হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে খবর। হাসপাতালে যাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। দিঘা হাসপাতালেই ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা।

বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে- ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তথা অভিনেতা দিগন্ত বাগচীর কথায়, “হয় ও সাঁতার জানত না, বা কোনও ভাবে আটকে পড়েছিল। হঠাৎ টেকনিশিয়নরা চিৎকার করতে করতে বলেন, ‘রাহুলদা ডুবে যাচ্ছে’। যখন উদ্ধার করা হয়, তখনও বেঁচে ছিলেন রাহুল।’’ অন্য দিকে, রাহুলের গাড়ির চালক বলেন, ‘‘রাহুলদা সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি বার বার বারণ করছিলাম। শোনেনি আমার কথা।’’ অভিনেতাকে হাসপাতালে যাওয়ার সময় ওই ধারাবাহিকের প্রোডাকশন ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘তখন শুটিং প্যাকআপ হয়ে গিয়েছিল। ৫টা-সাড়ে ৫টা বাজে (সন্ধ্যা) তখন। ঘড়ি দেখার সময় ছিল না তখন আর। শিল্পীদের ছেড়ে দিচ্ছিলাম এক এক করে। অম্বরীশদা (ভট্টাচার্য), ভাস্করদার (চক্রবর্তী) গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। তখনই ফোন আসে আমার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে সৈকতে পৌঁছোই আমি।’’ চন্দ্রশেখর আরও বলেন, ‘‘ওকে গাড়িতে তোলার পর আমি সামনে উঠলাম। লাল কাপড় নাড়াতে নাড়াতে হাসপাতাল পৌঁছোই। শহরে ঢোকার পর থেকেই যানজটের জন্য দেরি হয়ে যায়। রাস্তায় যেতে যেতে রাহুলের বুকে হাত বোলাচ্ছিল আমাদেরই টেকনিশিয়ানরা। যদি বাঁচানো যায়, সেই আশায়। প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছিল রাহুল।’’ তিনি জানান, হাসপাতালে যাওয়ার পথেই সম্ভবত হার্ট অ্যাটাক হয় রাহুলের। ওই ২০-২২ মিনিটের মধ্যেই মারা যান তিনি। অভিনেতা ভাস্কর জানিয়েছেন, ‘‘তিনটেয় প্যাক আপ হয়ে যায়। তিনি বেরিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর জানতে পারেন, জলে ডুবে গিয়েছেন রাহুল। আধ ঘণ্টা পর খবর পান রাহুল মারা গিয়েছেন। কোনও ইনটক্সিকেসন (মাদক জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ) ঘটনা ঘটেনি।’ প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, "আমাদের চিত্রনাট্যে জলের কোনও দৃশ্য ছিল না। শুনেছি, সেই সময় ওকে অনেকে বার বার মানা করছিল জলে না নামার জন্যে। এমনকি, বাকি শিল্পীদের গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কারও বারণ শোনেনি ও।"

অভিনেতার বাইরে আরও একাধিক পরিসরে বিস্তৃত ছিলেন তিনি। লেখালেখিতে সাবলীল ছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছিলেন যথেষ্ট অ্যাকটিভ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পাঠ করা কবিতা মন ছুঁয়ে যেত। নিজের কাজের, পেশার বাইরেও একাধিক বিষয়ে মন্তব্য ছিল ক্ষুরধার এবং প্রয়োজনে কৌতুকমাখা।

১৯৮৩ সালে ১৬ অক্টোবর জন্ম রাহুলের। ছোট থেকেই বেড়ে ওঠা থিয়েটারের পরিবেশে। বিজয়গড় থিয়েটার দলে অভিনয় করতেন রাহুলের বাবা। সেই সূত্র ধরেই অভিনয়ের প্রথম ভালোবাসা তৈরি। এমনকী, এই মঞ্চ থেকেই অভিনয়ে হাতেখড়ি। তারপর প্রথম কাজ সিরিয়ালে, ২০০৬ সালে খেলা-য়। সেখান থেকেই আসে প্রথম সিনেমার অফার। সিনেমার পাশাপাশি সিরিজ-সিরিয়ালেও নিজের অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page