
স্বর্ণ ালী গোস্বামী
21 Jun 2026
শুধু শরীর নয়, মনকেও সুস্থ করে যোগাভ্যাস। তাছাড়া একটা আধ্যাত্মিক ভাবও জাগ্রত করে এই যোগ
শুধু শরীর নয়, মনকেও সুস্থ করে যোগাভ্যাস। তাছাড়া একটা আধ্যাত্মিক ভাবও জাগ্রত করে এই যোগ। যদিও সেক্ষেত্রে নিজের মনের একাগ্রতা হলেই শুধু চলবেনা, ঈশ্বরে ভক্তি ব্যাপারটাও প্রয়োজন। তবে শরীর- মনকে ভালো রাখতে যোগাভ্যাসের তুলনা নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সারা বিশ্বে এই যোগের প্রচার করছেন, যা অবশ্যই ভারতীয় হিসেবে গর্বের বিষয়। এবার প্রথম আমাদের রাজ্যে উৎসবের মেজাজে যোগদিবস পালন করা হল। এ বারের থিম ছিল ‘স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের জন্য যোগা’। ১২ বছর আগে থেকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালন শুরু হলেও পশ্চিমবঙ্গে এর আগে সরকারি উদ্যোগে কখনও যোগ দিবস পালিত হয়নি।
কলকাতায় এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। রেড রোডে সাজো সাজো রব গত এক সপ্তাহ জুড়ে। ২১ জুন প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হল দেশের অন্যতম বৃহত্তম যোগ সমাবেশ। কলকাতা সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক ক্ষণের। রাজ্যের সব প্রান্তের প্রচুর মানুষ অংশগ্রহন করেছিল এই উৎসবে। পাশাপাশি সমগ্র দেশেও পালিত হল আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। আজ যোগ দিবসের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং শ্রী অরবিন্দের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলার মাটি যুগে যুগে মানবকল্যাণ ও আত্মজাগরণের বার্তা দিয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দও যোগ ও আত্মশক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে বহু আগেই বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিলেন। শিকাগোর ধর্ম মহাসভা থেকে যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বার্তা তিনি দিয়েছিলেন, আজ যোগ সেই বার্তাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, মানুষের পরিচয় আশপাশের মানুষের সঙ্গে জুড়ে থাকায়। এই জুড়ে থাকার কথাই বলে যোগ।
এখন চারদিকে জিমের রমরমা। এই জিম ব্যাপারটা বাইরে থেকে এসেছে। আমাদের দেশীয় পদ্ধতি হল যোগ। আমাদের ছোটবেলায় জিমের ব্যাপার ছিলনা। স্কুল থেকেই যোগাসনের পাঠ শিখতাম আমরা। ফিজিক্যাল এডুকেশনে যোগাভ্যাস রীতিমতো একটা বিষয় ছিল। এখন তো আমাদের মেয়েরা ড্রিল করেই ক্ষান্ত দেয়। আমাদের ড্রিল ছিল ছোটবেলায়, ক্লাস নাইন এবং টেন এ যোগাসন ছিল। মাধ্যমিকেও যোগাসন করতে হয়েছে আমাদের। জানিনা এখনও সরকারি স্কুলে তা হয় কি না। সবার কি হয় জানিনা। আমি কিন্তু যোগাসন শেখার পর তা নিয়মিত চর্চা করতাম। আসলে আমি কিছু একবার শিখলে তা চর্চার মধ্যে রাখতে পছন্দ করি, তাই বলেই হয়তো সেটা করতাম। তারপর কলেজে হস্টেলে গিয়ে মালদার চৈতালিদির পাল্লায় পড়ে সেই চর্চা রীতিমতো রোজের হয়ে গিয়েছিল। ওদের বাড়িতে যোগাভ্যাসের চর্চা ছিল, তাই চৈতালীদিও রোজ করত। আমি উৎসাহ পেয়ে তা আয়ত্ত করে নিয়েছিলাম, যেটা বজায় ছিল বিয়ের আগে নিয়ম করে। পশ্চিমোত্থান আসন করায়ত্ত করতে পেরেছিলাম। বিয়ের পরেও প্রায়শই আসন করতাম নিজের মত করে সময় বের করে। ২০১৩/১৪ অব্দিও সর্বাঙ্গাসন, হলাসন, ভূজঙ্গাসন, উষ্ট্রাসন করতে পারতাম। তবে পশ্চিমোত্থান আসনে কনুই আর মাটিতে ছুঁতো না। যদিও হাতের আঙুল দিয়ে পায়ের আঙুল ছুঁতে পারতাম। তারপর জীবনের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেল। নিজের জন্য সময় অনেক কমে গেল। যোগাসন তখন অতিরিক্ত চাপ মনে হতে লাগল। তবে স্ট্রেচ করতাম মাঝে মধ্যে সময় পেলে। মেয়েকে দেখাতে মাঝে মধ্যে আসন করতাম। নিয়মিত নয়। এখন সর্বাঙ্গাসন, হলাসন ভূজঙ্গাসন পারি, আর কিছু হয়না। বলতে নেই, তেমন তেমন অসুখ কিন্তু এখনও এই পঞ্চাশোর্ধ বয়সেও কব্জা করতে পারেনি। প্রেসার নেই, ডায়াবেটিস নেই, কোমরের- হাঁটুর ব্যাথা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। কাজেই ছোট থেকে এই আসন অভ্যাস করলে শরীর অনেক নমনীয় থাকে।
তবে আজকালকার বাচ্চারা যথেষ্ট জিম প্রেমী। আমার মেয়েকেই তো বলে বলে যোগাসনের প্রতি অনুরক্ত করতে পারিনি। বললে হয়ত একটু করল, ব্যাস ওই পর্যন্তই। নিয়ম করে নিজে থেকে করে না একেবারেই। জিমের প্রতি আগ্রহী বেশি। আমি গুরুত্ব দিই না বলে বেশি মাতামাতি করতে পারেনা। আমার ধারণা বাড়ির সাধারণ কাজ, জলের বালতি তোলা, ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে জিনিসপত্র ওঠানো- নামানো নিয়মিত করলেই জিমের সাবস্টিটিউট হয়ে যায়। কিন্তু ওই যে। তাতে ব্যাকডেটেড হয়ে যায় মানুষ। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা গচ্ছা দিয়ে বিদেশী জিনিসকে আপন করার মধ্যেই আধুনিক মনস্কতার পরিচয় হয়। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে কিন্তু বিদেশিরা আমাদের যোগাসনকে ইদানিং যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদেশে প্রচুর 'ইয়োগা ক্লাস' করানো হয়। শরীর, মন ভালো রাখতে তারা এই যোগ ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। যেমন আমাদের আধ্যাত্মিকতা বিদেশে এখন যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডাক্তারেরা যেখানে শরীরের অদ্ভুত ধরনের ব্যাথার উপশম করতে পারেননা, সেখানে যোগাসন বা যোগ অনায়াসেই তা করে দেয়। আজই একটা ফেসবুক পোস্টে পড়ছিলাম, অদিতি বসু রায় লিখছেন, তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুলে চিনচিনে ব্যাথা থেকে তা ধীরে ধীরে গোটা হাতটাকেই অবশ করে দিয়েছিল। কিছু করতে পারতেন না ওই হাত দিয়ে। এমনকি রুটিও ছিঁড়ে দিতে হত অন্য কাউকে। দু'জন ডাক্তারকে দেখানোতে দুজনেই একই রোগের নাম বলেছিলেন- টেনোভাইটিস। তার জন্য হাতে একটা বেল্ট মতো বেঁধে রাখতে হবে সারাক্ষন। যা অতি বিষম একটা ব্যাপার মনে হচ্ছিল অদিতির। কিন্তু ফের সমস্যা। ডাক্তারের নিদান হল- শিরা চিরে অপারেশন করতে হবে। বেলুন থেরাপি বলা হয় সাদা ভাষায়। তারপর একজন যোগ করার পরামর্শ দেন তাঁকে। দু'মাসের মধ্যে ম্যাজিকের মত ব্যাথা আউট। এর পাশাপাশি মাইগ্রেন, সাইনাসেরও সমস্যা ছিল তাঁর। তাও গায়েব। দশ বছর ধরে ন্যাসাল ড্রপ ছাড়া ঘুমোতে পারতেন না তিনি। সেটাও সেরে গেল এই যোগাভ্যাস করে। কাজেই শুধু কথার কথা নয়। আগামী প্রজন্মকে সুস্থ সবল করে গড়ে তুলতে গেলে এবং তার পাশাপাশি আমাদের মত পঞ্চাশোর্ধ নাগরিকদের সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকতে গেলে যোগাভ্যাসের মত অভ্যাসের জুড়ি নেই।