top of page

সোশ্যাল মিডিয়া- নতুন দিগন্ত! সামলাতে জানতে হবে

স্বর্ণালী গোস্বামী

11 Jan 2026

হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে যাই করতে হবে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। আমাকে নিয়ে যেন কেউ নিজের মত করে পুতুল নাচ নাচাতে না পারে, সে বিষয়ে আমায় সতর্ক থাকতে হবে

দেশে- বিদেশে তথা রাজ্যে প্রচুর বিষয় এই মুহূর্তে লেখার জন্য। আমার ধারণা এই অস্থির করা বিষয়গুলি কিছুতেই বন্ধ হবেনা। আগামীতেও কিছু না কিছু টপিক পেয়েই যাবো লেখার। তবে যে বিষয়টি বেশ কিছুদিন থেকেই আমার মনে নাড়া দিয়েছে এবং তার কারন বিশ্লেষণ করতে মন চেয়েছে, তাই নিয়েই আজ কথা হোক।

আড্ডা যখন তখন যে কোনও বিষয় নিয়েই হওয়া যুক্তিসঙ্গত। তার ওপর আমরা প্রথমে বাড়ি তারপর সমাজ, তারপর রাজ্য, তারপর দেশবাসী। তাই আমার আশপাশে সাধারণ মানুষের সাথে কি ঘটছে, তা অবশ্যই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতেই পারে। আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু তো বটেই। আজকাল, বলা ভালো শেষ দশ বছর সমাজমাধ্যমে এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশ ২০১২ সালের শেষের দিকে। তার আগে থেকেই ফেসবুক, অর্কুট ছিল। তবে আমি অ্যাকাউন্ট বানাইনি। সময় পেতাম না। ছিল শুধুমাত্র লিংকডইন এ। বাড়িতে মেয়ে তথা সংসারের প্রতি মনোনিবেশ করাকে প্রাধান্য দেওয়ায় রোজ অফিস যাওয়া থেকে বিরতি নিতে হয়েছিল বাধ্য হয়েই। তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আগমন। আমার মনে আছে, পূর্ব পরিচিত একজন 'কী করছি' জিজ্ঞেস করায় আমি বলেছিলাম, কিছু না, তবে ফেসবুকে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছি, ওখানেও টুক-টাক যা মনে হয় মাঝে মধ্যে লিখে পোস্ট করার ইচ্ছে আছে। দেখলাম চাউনি বেশ তাচ্ছিল্যের। বুঝিনি, এমন কেন করল। তারপর বেশ ক'দিন যাওয়ার পর থেকে দেখলাম অপরিচিত লোকজন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছে। আমার রিকোয়েস্ট মোডে শুধু ফ্রেন্ড রিলেটেড কারো রিকোয়েস্ট আসতে পারবে এমনই করা ছিল শুরু থেকেই। তারপর মেসেঞ্জারে অপরিচিত লোকজনের মেসেজ রিকোয়েস্ট আসছে। ক'দিন চুপ থাকলেও কৌতূহল হল, দেখি তো কি ব্যাপার! মেসেঞ্জারে অন করে দিলাম রিকোয়েস্ট। তার পর ফেসবুকে ফ্রেন্ড করার অনুরোধ। পরিচয় জানলাম। রাখলাম ফ্রেন্ড লিস্টে। বলা ভালো কয়েকদিন অ্যাকাউন্ট ওনলি ফ্রেন্ড করলেও আমি পরে পাবলিক করে দিয়েছিলাম আমার অ্যাকাউন্ট। অইলে লোকজন আমার লেখা পড়বে কিভাবে এই ভেবে।

তা এবার থেকে শুরু হল সেই সব অনামী বন্ধুকূলের (সর্ব সাকুল্যে ৪/৫ জন ছিল বোধহয়) ভাট বকা। কি করছি, কি খাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি দিয়ে শুরু করে সারা দিনের দিনপঞ্জি জানতে চায় দেখি। বিরক্ত লাগলেও মনে হতে লাগলো, যাকগে কথা বলছি, কারো সঙ্গে- তাই বা খারাপ কি? মেয়ে নিয়ে সংসার নিয়ে বীতশ্রদ্ধ আমি ভাবতে শুরু করলাম বেশ একটা এন্টারটেইনিং ব্যাপার। টিভি তো দেখতাম না, বই পড়ার ইচ্ছে করত না, সারাক্ষণ অস্থির লাগত, কাজ সদ্য বন্ধ হয়েছে তো, কিভাবে নতুন করে শুরু করব- কোনও কিনারা পেতাম না। তাই অদেখা বন্ধুত্বের কথা- বার্তাই একটু এন্টারটেইনিং লাগত। আর ছিল সারা দিন এফএম শোনা। কিন্তু আস্তে আস্তে দিন যত যেতে লাগল, দেখলাম আগল কাটছে। শুরুতেই বলেছিলাম, বেশি কথা আমি পছন্দ করিনা। কে কার কথা শোনে? বুঝতে পারছিলাম- এই বন্ধুত্বের নামেই নিজেদের তারা এক একজন সেলিব্রিটি ভাবতে শুরু করেছে। যা নয় তাই বলতে শুরু করেছে। নিজেকেই মনে হচ্ছে যেন দোষী- কেন খাল কেটে কুমির টেনে আনলাম! নিজের স্ট্র্যাটেজি দিয়ে টানা দুই বছর এই চলল। তার পর এক এক করে ব্লক করা শুরু করলাম। নাছোড় সেই সব হনু সেলিব্রিটি চারদিকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যদি আমার নাগাল পাওয়া যায়। সমানে ব্লক করা শুরু করেছি আমি তখন। মোটামুটি ২০১৬ থেকে নিশ্চিন্ত হতে পেরেছিলাম। ততদিনে আমি ওয়ার্ক ফ্রম হোম- কাজ করা শুরু করেছি। তো এই হল আমার সোশ্যাল মিডিয়ার অভিজ্ঞতা।

তবে এটাও ঠিক, বেশ কিছু ভালো লেখা লিখেছিলাম আমি। এখনও সেই সব লেখা ফেসবুকে এলে পড়তে বেশ লাগে। একটা অ্যালবাম বানিয়ে তাতে আবার ওয়াটারমার্ক দিয়ে লেখাগুলো পোস্ট করতাম। এবারে এই ২০১৬ থেকে ২০২৬ এর গোড়া- এরই মধ্যে চোখের সামনে দেখতে পেলাম সোশ্যাল মিডিয়ার কি সাংঘাতিক রেভোলিউশন! কোথা থেকে কি হচ্ছে আজকে দাঁড়িয়ে! সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যান্য ভিডিও দেখার পাশাপাশি লাইফস্টাইল ভ্লগ আমি দেখতে শুরু করি ২০২২ থেকে। তার আগে ফোনে বা ল্যাপটপে ইউটিউবে সিনেমা/ শর্ট ফিল্ম, ডকুমেন্টারি ফিল্ম ই শুধু দেখতাম। কোভিডের পর একে একে ফিডে বিভিন্ন রকম ভিডিও আসতে থাকল। ইউটিউবে আমার এমন বেশ কয়েকটা ট্র্যাভেল ভ্লাগার, লাইফস্টাইল ভ্লগার, শেফ দের রান্নার ভিডিও সাবস্ক্রাইব ও করা আছে। নিউজ চ্যানেলও আছে, সেটা তো আমার কাজের জন্য, এছাড়া হালের পডকাস্ট ভিডিও। সেগুলো আমি নিজে ঋদ্ধ হওয়ার জন্যই দেখি সাবস্ক্রাইব করে। সেগুলো আলাদা। তা বাদেও আজকাল এই নিয়ে বেশ এন্টারটেইন হওয়া যায় বিভিন্ন রকম ভিডিও দেখে। তবে ফেসবুকে এমন কোনও পেজ আমার সাবস্ক্রাইব করা নেই। সেগুলো শুধুই স্ক্রোল করতে করতে যা আসে, তাই দেখা। আর আজকাল এআই এর দৌলতে দু থেকে তিনবার কোনও পেজ/ চ্যানেল দেখলেই বারে বারে আমার সামনে তা এনে হাজির করা হবে। তো সেভাবেই বেশ কিছু নতুন ভ্লগারদের সঙ্গে আমার পরিচয়। বেশ খুনসুটি ভরা, মজার পোস্ট করে তারা। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে (অবশ্যই আমার কাছে) নিজেদের অন্যান্য কাজের পাশে ফেসবুক, ইউটিউব করে।

তেমনভাবে চেনা দেবলিনা, সায়ক, সুস্মিতা, অনন্যা, সুকান্ত, প্রেরণা ইত্যাদিদের সঙ্গে। একটা বন্ধু মহল এরা। প্রত্যেকেই সিরিয়াল অভিনেতা- অভিনেত্রী। দেবলিনা এদের মধ্যে আলাদা। ও গান গায়। সুকান্ত সদ্য চাকরি ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে ফেসবুক করবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেবলিনার গানের ভিডিওই দেখতাম শুরুতে। তারপর দেখলাম বিয়ে করল এবং ডেইলি ভ্লগ শুরু করল। খুব সম্প্রতি আমি এই ধরনের ভিডিও আবার দেখছিলাম না। একটু একঘেয়ে লাগছিল- এই আর কি। খারাপ কিছু না। মাঝখানে পাকিস্তানের একটা সিরিয়াল আমার সময় নিয়ে নিচ্ছিল। তা সেটাও শেষ হয়েছে। ও বলা ভালো। ইউটিউবে আমি এক সময় প্রচুর বাংলাদেশের নাটক দেখেছি। অসাধারন লাগত দেখতে। তা যাই হোক, এবারে হঠাৎ দেখি 'দেবলিনা ভালো আছে' বলে সায়কের একটা পোস্ট আমার ফিডে। আমি ভাবলাম কী হল ব্যাপারটা? খুঁজে দেবলিনার তার আগে করা লাইভটা দেখলাম। পুরোটা না দেখলেও বিষয়টা বুঝতে আর বাকি ছিলনা।

যেখান থেকে শুরু করেছিলাম- এই ফেসবুক/ ইউটিউব ব্যাপারটা না একটা নেশার মত। সময়মতো বেরিয়ে আসতে না পারলে কোথায় যে আমাদের ঠেলে দেবে আমরা নিজেই হয়ত বুঝতে পারব না। তার ওপর আছে টাকার নেশা- আজকাল সবাই বড়লোক হতে চায়! সবাই সেলিব্রিটি হতে চায়! সেটাও একটা মস্ত ফাঁদ।

প্রবাহও এই ফাঁদে পা দিয়েছিল। বেচারা ইন্সটা তে দেবলিনাকে মেসেজ পাঠিয়ে তার রিপ্লাই পেয়ে নাচানাচি শুরু করে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে স্বপ্নের রাজকন্যা ধরা দিল একেবারে বাহুডোরে! প্রবাহও এবারে সেলিব্রিটি! আগে তাকে কেউ চিনত না। এখন সকলে চেনে। এদিকে প্রবাহর বাড়ি ভাবছে, এই তো ছেলে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। চেপে ধরতে হবে এবারে। দেবলিনা খুব ভালো গায়, দেখতে সুন্দর। কিন্তু তেমন প্রথম সারির গায়িকা তো সে নয়। মাচা করে। শিক্ষিত পরিবার, ব্যাপারগুলো বোঝে। সেই মেয়েকে প্রশ্রয় দেওয়া একেবারেই চলেনা। তার ওপর সেলফ মেড একটি মেয়ে। মা- বাবা- পরিবারের কোনো পরিচিতি বা কহতব্য শিক্ষা নেই। এদিকে দেবলিনা তো সেলিব্রিটি অনেক দিন থেকেই। রোজগারও কিছু কম করেনা। তার তো সেই সুলভ আচরণ থাকবেই। স্বাভাবিক। নিজে নিজেকে তৈরী করেছে। আমি এভাবে উঠে এলে আমারও থাকত। পাশাপাশি চাইছে স্বামীর নিখাদ ভালোবাসা, অধিকারবোধ, নিজের বাড়ি এবং শ্বশুর বাড়ি নিয়ে থাকতে। সেখানেই গোল বেধেছে মূলতঃ। প্রবাহর বিয়ের পরে মোহ কেটে গেছে। সে পাইলট, এখন সেও সেলিব্রিটি। কম কিসে? শুরু হয়েছে শিক্ষা দিয়ে ঠেস দেওয়া। রাতে বাড়ি ফেরা নিয়ে অশান্তি। মায়ের সঙ্গ ছাড়ার নিদান। দেবলিনাও ছাড়ার পাত্রী না। সেও সব দিক সামলে চলতে চাইছে। সঙ্গে রয়েছে সর্বক্ষণের ক্যামেরা! আর সামাল দিতে পারল না মেয়েটা।

এমনিতেই আমাদের সমাজে মেয়েদের বিয়ের পর নতুন মুরগি ভাবা হয়। কতক্ষনে তার জবাই হবে, সে জন্য ওঁৎ পেতে থাকে শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকে। বাপের বাড়ি নড়বড়ে হলে তো নাকানি- চোবানি খেতেই হয় বিয়ের পর। তেমনভাবে সামলাতে না পারলেই সমস্যা তৈরী হয়। আগেকার দিনে মেয়েরা মেনে নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে থেকে যেত শ্বশুরবাড়িতে। এখন তো তা হয়না। ফলে কেউ স্বামীকে তার পরিবার থেকে আলাদা করতে সক্ষম হয়, কেউ নিজের পরিবার ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, নইলে দেবলিনার মত দশা হয়। তবে সুইসাইড বা আত্মহত্যা করতে চাওয়া কোনও সমাধান হতে পারেনা কখনোই। এটা অবশ্যই সত্যি। জীবনে ভালোবাসা যদি অপরদিকে থেকে না পাই তাহলে একতরফা ভালোবেসে একসঙ্গে ঘর করা মানে চূড়ান্ত বোকামি। তা এখনও যেমন প্রযোজ্য, তেমনি আগেও ছিল। বহু শিল্পীদের আত্মহত্যা বা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার গল্প আমরা জানি এই ভালোবাসার কাঙাল হওয়ার ফল। এখন তা কেন হবে? জীবনে কঠিন পরিস্থিতিতে লড়াই করে বেঁচে থাকাই তো আসল জয়ীর কাজ। সেটা বুঝতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে মেয়েদের। যেভাবে হোক, বেঁচে থাকতে হবে. নিজের কাজ করে যেতে হবে, নিজেদের মাথা উঁচু রাখতে হবে, সমাজে নিজের জীবন দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তবেই তো মানব জন্ম সার্থক!

সোশ্যাল মিডিয়া থাকবে। তার ট্রোলিং থাকবে। তার ভালো- মন্দ থাকবে। যে ট্যাকল করতে পারবে, সে নিশ্চিন্তে করুক না। কিন্তু যে ট্যাকল করতে পারবে না, সে যেন সরে আসে। টাকা আসে এই ভ্লগিং থেকে। কাজেই যারা সেই টাকা রোজগার করতে পারছে, করুক। তাদের ট্রোলিং- এরও জম্পেশ জবাব দিতে জানতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইগনোর করতে শিখতে হবে। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে যাই করতে হবে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। আমাকে নিয়ে যেন কেউ নিজের মত করে পুতুল নাচ নাচাতে না পারে, সে বিষয়ে আমায় সতর্ক থাকতে হবে।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page