
স্বর্ণালী গোস্বামী
14 Jun 2026
মমতা- অভিষেকের হাতে একেবারে হাতেগোনা গুটিকয়েক নেতা
শেষমেশ ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’- নামগোত্রহীন একটি দলে নাম লেখালেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী। আইনি জটিলতা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে খবর হয়েছিল গতকালই। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিদ্রোহীদের দলে! যাকে নিয়ে ২০২৪ এ এত নাটক, মমতার দাপাদাপি- সুদীপকে জেতাতেই হবে! আহারে- সেই সুদীপও? শতাব্দী রায়ের সঙ্গে দিল্লি গিয়ে শনিবার তিনি বিদ্রোহীদের দলে নিজের নাম লিখিয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া মমতার নির্বাচনী প্রতীক ঘাসফুল হাতছাড়া হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকছে। কুনাল আবার বলছেন- এর সঙ্গে ভ্রাম্যমান বিউটি পার্লার ফ্রি- যাঃ এমন কেউ বলে? তা সোয়ামি গেলে তার ধরমপত্নী পিছু পিছু যাবেনা? তাই কখনো হয়? একে একে টিক মারতে মারতে দুই এর পিঠে দুই হতে চলেছে। যদিও তিনি সাংসদ নন এটাও ঠিক।
তৃণমূলের সমূলে উৎপাটিত হতে আর কি কিছু বাকি রইল? এই ব্যাপারটা অবধারিতই ছিল। আমি ভেবেওছিলেম। তবে সত্যি বলতে তা যে এত তাড়াতাড়ি ঘটবে, সেটা একেবারেই মালুম হয়নি। শুরু হয়েছিল সেই শুরুর দিন থেকে। যেদিন একদিকে শুভেন্দু ব্রিগেডে শপথ নিলেন আর মমতা করুণ সুরে সাদামাটাভাবে শাড়ি পরে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করলেন নিজের কালীঘাটের বাড়ি থেকে। বিশ্বাস করুন, দলের পরিণতির কথা জেনেও এমন বালির বাঁধের মত ধসে যাওয়া সেদিনও কল্পনায় আসেনি।
বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে তৃণমূল থেকে নির্বাচিত হলেন বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তিনি প্রথমদিন সেই হিসেবে বিধানসভায় উপস্থিতও রইলেন। কিন্তু তারপর থেকেই শুরু হল একেবারে ধুঁয়াধার সিনেমার প্লটের মত ব্যাপার- স্যাপার। দুর্নীতির পাহাড় চোখের সামনে আসতে শুরু করল তিলজলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে। সেই যে বুলডোজার গেল সেখানে, তারপর শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ নির্মাণের রমরমা সামনে আসতে লাগল। একে একে বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের নেতারা দুর্নীতির দায়ে ধরা পড়তে লাগলেন। কাউন্সিলারদের বিপুল পরিমান সম্পত্তি সামনে আসতে লাগল। এমনকি জমির মধ্যে থেকে বস্তা বস্তা নোট উদ্ধার হল! ভাবা যায়! বাঘা বাঘা নেতারা সব পুলিশের, ইডি র ঘেরাটোপে বন্দী হতে থাকলেন। সুজিত, স্বরূপ ইত্যাদি অনেক নাম। বিভিন্ন তৃণমূল কার্যালয় থেকে উদ্ধার হতে লাগল বিলি না হওয়া ডাঁই করে রাখা প্রচুর ত্রাণ সামগ্রী। বাকি ছিল আরও। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে টাকার বান্ডিল, গুপ্ত সুসজ্জিত অত্যাধুনিক বেডরুম, সেখানে কন্ডোম, অস্ত্র- শস্ত্র ইত্যাদি আরও কত কি...।
এদিকে বিরোধী দলনেতা শোভনদেবের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রমান করতে তৃণমূলের বিধায়কদের সই করা চিঠি চাওয়া হল। তাই নিয়ে কিছুদিন ধানাইপানাইয়ের পর তা পেশ করা হল। সেখানেও হঠাৎ বলা হল ওই চিঠিতে সই জাল করা হয়েছে। কে করেছে, কে করেছে? কে বলল, কে বলল? ধরা পড়ল নাটের গুরু ঋতব্রত এবং সন্দীপন। বার করে দাও দল থেকে। হল তাই। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হলেন দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ ও 'দলবিরোধী কার্যকলাপের' অভিযোগে ১ জুন ২০২৬ দল তাঁদের বহিষ্কার করল। এইবার খেলা শুরু হল। ঋতব্রত এবারে ৫৮ জনকে নিয়ে একটি দল গড়লেন। আরও ২ জন যুক্ত হবেন অবধারিতভাবে তা বলে দিলেন। তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব স্বীকার করছেন না। ৮০ জনের মধ্যে ৬০ জনই যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে মমতার হাতে আর কী রইল? বিক্ষুব্ধরা বললেন, তারাই আসল তৃণমূল। তারা দুর্নীতি প্রশ্রয় দিচ্ছেন না এবং জনগনের রায় মেনে নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন বিধানসভায়।
আরও একটা ব্যাপার ঘটে গেছে ইতিমধ্যে। মমতা এবং অভিষেক কিছুতেই এই হার মেনে নিতে পারছেন না শুরুর দিন থেকে। চেঁচাচ্ছেন রীতিমতো! বিজেপি ভোট লুঠ করেছে বলে। অন্যদিকে বিজেপির সমর্থক তথা নিচুতলার কর্মীরা নেতাদের অনুমতি ছাড়া তো কাউকে সবক শেখাতে পারছেন না। ভোট পরবর্তী হিংসা হয়নি বললেই চলে। তারা এবারে এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন। তৃণমূল নেতাদের দিকে ডিম ছুঁড়তে লাগলেন, সঙ্গে চোর চোর স্লোগান। বর্ষীয়ান নেতা সৌগত রায়ের গাড়িতে ডিম ছোঁড়া হল। তিনি যারপরনাই রেগে গেলেন। তবে সাংবাদিকেরা তাঁকে শান্ত করায় তিনি পরে স্বাভাবিক হয়েছিলেন। এই ব্যাপারটা মারকাটারি আকার ধারণ করল যখন দীর্ঘদিন পর অভিষেক বেরোলেন সোনারপুরে দলীয় এক কর্মীর মৃত্যুতে স্বান্তনা দেবার উদ্দেশ্যে। পুরো আন্তর্জাতিক খবর একেবারে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নিজেরই শহরে সাধারণ মানুষ দ্বারা আক্রান্ত। পুরো চড়াও হয়ে গিয়েছিল সেদিন সেখানকার সাধারণ মানুষ! সঙ্গে ছিল '[ডিম থেরাপি!' এই শব্দ বন্ধটি তাঁর ওপর প্রয়োগ হতেই শুরু হয়েছিল। তারপর সেটা একেবারে মোক্ষম দাওয়াই হয়ে গেল সকলের জন্য। গতকালও ডিম থেরাপি চলেছে নৈহাটিতে। অভিষেক বেচারা সাংবাদিকের ঘেরাটোপে থেকে মাথায় হেলমেট পরে কোনওমতে সে যাত্রা উতরোলেন। ননীর পুতুল সেই নেতা সেদিন ওই ঘটনার পর একেবারে হুইল চেয়ারে আসীন হয়ে গেলেন। এই হাসপাতাল, সেই হাসপাতাল ঘুরতে লাগলেন পিসির আঁচলের তলায় আশ্রয় নিয়ে। কিন্তু কোথাও ডাক্তারেরা তাঁকে ভর্তি নিলেন না। বলা হল কিছুই চোট নয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর রোয়াব দেখানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন 'শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও'।
পরিষদীয় দল তো গেল। সকলে রব তুলতে লাগল- সংসদীয় দলের কী হবে? তাঁরা কি কিছুই পদক্ষেপ নেবেন না? ততদিনে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে বিজেপি প্রোটেকশন দিয়ে দিয়েছে। তিনি দলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিয়েছেন, সাংসদ পদ বাদ দিয়ে। রাজ্যে কিছুই করতে পারছেন না দেখে মমতা এবারে দেশের পটভূমিতে নিজের প্রভাব কতখানি তা যাচাই করতে নামলেন। ডাকলেন ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক। পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের পর, ১০ মাস পরে বৈঠক। সেখানেও জোটের বেশিরভাগ শরিকই উপস্থিত থাকতে পারবেনা বলে জানিয়ে দিল। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তুলে বৈঠক বয়কট করল ডিএমকে। থাকল না আম আদমি পার্টিও। সিপিএম প্রতিনিধি পাঠালেও, তা নামমাত্রই। তাই সই, কংগ্রেস রইল, উদ্ধব ঠাকরে ও হেমন্ত সোরেন ভার্চুয়ালি যোগ দিল, আরও খুচরো কিছু দল উপস্থিত হল। এই বৈঠক যখন হচ্ছে, ঠিক সেই সময় তৃণমূলের সাংসদেরা ঢিল ছোড়া দূরত্বে মমতার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে। তাঁকে সাহায্য করছেন শতাব্দী রায়। একে একে ১৯ জন! একটি চিঠিতে সই করলেন। সেই চিঠি দেওয়া হবে স্পিকারকে। সংসদে আলাদা ব্লক চাইলেন তাঁরা। বিজেপির সঙ্গে নয়, আসল তৃণমূল হিসেবে ব্লক চাইছেন তাঁরা। সেই দলে আজ অব্দি প্রায় ২২ জন যোগ দিতে পারেন বলে খবর।
অন্যদিকে পদত্যাগ করলেন সুখেন্দুশেখর রায় সহ রাজ্যসভার ৪ সাংসদ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন তৃণমূল কী আদৌ তাদের লোগো নিজেদের এক্তিয়ারে রাখতে পারবে? আজ রবিবার তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা ফের এক দফা বৈঠকে বসলেন দিল্লিতে। এ বারও বৈঠক সেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাংলোতেই। ৯, মতিলাল নেহরু মার্গের বাংলোয় ওই বৈঠকে রয়েছেন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবেও। অপরদিকে সাগরিকা ঘোষ এবং কীর্তি আজাদ গিয়েছেন ২০, আকবর রোডে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে। লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি জমা দিলেন তাঁরা। তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য না শুনে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে মান্যতা না দেওয়ার আর্জি অধ্যক্ষকে। তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা অভিষেক তিন পাতার ওই চিঠিতে লেখেন, “তৃণমূল একটি অখণ্ড রাজনৈতিক দল। আইনতও তৃণমূল একটিই।” তৃণমূলের সংসদীয় দলের মধ্যে কোনও পৃথক গোষ্ঠীকে যাতে স্বীকৃতি না-দেওয়া হয়, স্পিকারের কাছে সেই আর্জিও জানান তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সাগরিকা ঘোষের দাবি, সংসদীয় কক্ষে এই ভাবে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করা যায় না। এই পদক্ষেপ অসাংবিধানিক ও বেআইনি।
‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’- নামগোত্রহীন একটি দলে নাম লেখালেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী। ওই দলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন তারা। রবিবার সন্ধ্যায় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে এমনটাই জানিয়ে এলেন তৃণমূলের বিদ্রোহী ব্লকের ২০ জন সাংসদ। দলটি ত্রিপুরার। যদিও নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, এই নামের একটি দল ২০২৩ সালে আরইউপিপি (রেজিস্টার্ড আন রেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি) তালিকাভুক্ত হয়। ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া। যদিও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দলটি এনসিপিএন নামে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসকজোট এনডিএ-কেই সমর্থন করবেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারেরা। খবরটির সত্যতা স্বীকার করেছেন তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতা- অভিষেকের হাতে একেবারে গুটিকয়েক নেতা রয়েছে। তার ওপর কল্যাণ মাঝে ক্ষেপে উঠেছিলেন। পরে যদিও ঠান্ডা হয়েছেন। গতকাল কুনালের সঙ্গে অভিষেকের একপ্রস্থ ঝগড়া- ঝাঁটি হয়ে গেছে। ফিরহাদ ইতিমধ্যেই ঋতব্রতর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। অভিষেক সমানে ইডি দফতরে যাচ্ছেন আবার পুলিশও তাঁর বাড়ি যাতায়াত করছেন নিয়মিত, তালা- টালাও ভাঙা হচ্ছে। অভিষেকের দেমাক কিন্তু অব্যাহত, সকলেই তাজ্জব বনে যাচ্ছেন কিন্তু বেচারা সর্বভারতীয় সম্পাদক বলে কথা- তা দল থাক আর নাই বা থাক। পিসি পদ টা তো দিয়ে দিয়েছে। তার একটু বহিঃপ্রকাশ না হলে চলে? তাও কল্যাণের হুমকি মেনে তাঁকে গুরুজন বলেছে- তাই না তাই!