
স্বর্ণালী গোস্বামী
6 Sept 2026
তাঁর অননুকরণীয় অভিনয় এবং ক্যারিশমা- যা বাংলা তথা বাঙালির সম্পদ হয়ে থাকবে, যতদিন বাংলা চলচ্চিত্র থাকবে, ততদিন
এই যে শতবর্ষ পেরিয়েও এত উচ্ছাস, এত আড়ম্বর, এত আনন্দ, এত কৌতূহল, এত আয়োজন- এও যে সম্ভব, তা কি স্বয়ং উত্তমকুমার ভেবেছিলেন কোনোদিন? মনে হয় না। জীবদ্দশায় যে অশান্তির মধ্যে দিয়ে জীবন কেটেছে তাঁর নিজের, তিনি বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেননি, সত্যিই এরকম কোনওদিন হতে পারে। বন্ধু- পরিচিতরা সমানে সুযোগ নিয়ে গেছে। প্রতি পদক্ষেপে সমালোচিত হতে হয়েছে আড়ালে, যা তাঁর কাছে অবিদিত ছিল না- এমনটা বলা যায়না। পেয়েছেন পরিজনদের কাছ থেকে অবহেলা। কিন্তু যেটার নড়চড় কিছুতে হয়নি, তা হল তাঁর কাজ। কাজের প্রতি নিষ্ঠা। কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। কলাকুশলীদের প্রতি মানবিক আচরণ। তাই তো তিনিই আজও সগৌরবে মহানায়কের আসনে আসীন রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বুঝতে পেরেছে, সমাজ শুধুই তাঁকে আড়ালে সমালোচনা করলেও, তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা থেকে তাঁকে নড়ানো যায়নি একেবারেই।
থিয়েটারের অতি-নাটকীয় ভাব কাটিয়ে ক্যামেরার সামনে কীভাবে একদম স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মতভাবে কথা বলতে হয়, তা তিনি নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছিলেন। সংলাপে এবং স্বর প্ৰক্ষেপনে তাঁর পরিমিতিবোধ ছিল অসাধারণ। সেই যুগের অতি-নাটকীয়তা বর্জন করে চলচ্চিত্রে এক স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত অভিনয়ের ধারা প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। চোখের চাহনি, মৃদু হাসি এবং শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তৈরি করেছিলরন রোমান্টিকতার নতুন সংজ্ঞা। 'সাড়ে চুয়াত্তর', 'অগ্নিপরীক্ষা', 'সাগরিকা', 'সপ্তপদী', 'হারানো সুর', 'ইন্দ্রাণী', 'দেয়া- নেয়া', 'শঙ্খবেলা' প্রভৃতি আরও বহু ছবিতে তিনি এই অসামান্য রোমান্টিকতার নিদর্শন রেখে গেছেন। তাঁর কণ্ঠস্বরের মডুলেশন বা ওঠানামা ছিল অসাধারণ। গম্ভীর কণ্ঠের সংলাপে যেমন আভিজাত্য প্রকাশ পেত, তেমনি কমেডি দৃশ্যে তাঁর সংলাপ বলার টাইমিং ছিল নিখুঁত। পাশাপাশি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় 'নায়ক' এবং 'চিড়িয়াখানা' চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি সমান্তরাল বা আর্ট ফিল্মেও সমানভাবে পারদর্শী। 'নায়ক' ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে গণ্য করা হয়। 'ছদ্মবেশী', 'ধন্যি মেয়ে', 'মৌচাক' বা 'ভ্রান্তিবিলাস' ছবিতে তাঁর কমিক টাইমিং এবং সূক্ষ্ম রসবোধ তাঁর অভিনয় প্রতিভার আরেকটি দিক ফুটিয়ে তোলে। 'অগ্নিশ্বর', 'সন্ন্যাসী রাজা', 'বিচারক', 'মরুতীর্থ হিংলাজ' এ অভিনয় যেন রীতিমতো চলচ্চিত্র পড়ুয়াদের পাঠ দান করার উপযুক্ত। উত্তমকুমার তাঁর অভিনয়কে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বেঁধে রাখেননি, বরং প্রতিটি চরিত্রে নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। এই বহুমুখী প্রতিভা এবং অভিনয়ের পরীক্ষা- নিরীক্ষার মাধ্যমে আধুনিকতার খোঁজ- ই তাঁকে বাঙালির চিরকালের 'মহানায়ক' করে তুলেছে।
জন্মশতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর ব্যক্তিত্ব, অভিনয়ক্ষমতা, সংগ্রাম, প্রভাব, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা—সবই এখনো বাঙালির নিত্যদিনের চর্চার বিষয়। একসময় উত্তমকুমার টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়া চষে বেড়িয়েছেন একটু সুযোগের আশায়। এই অধ্যবসায়ের তাৎক্ষণিক ফল প্রথম দিকের যে সিনেমাগুলো, তার প্রায় সব কটাতেই তিনি ব্যর্থ হন। ব্যর্থতা দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। সিনেমায় উত্তমের প্রথম আত্মপ্রকাশ ১৯৪৮ সালে—‘দৃষ্টিদান’ সিনেমায়। এতে তিনি নায়ক নন, ছিলেন পার্শ্বচরিত্রে। সিনেমা ফ্লপ হয়। ভবানীপুরের নেহাতই মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ছোটবেলায় থিয়েটার দেখে অভিনয়ের প্রতি ভালো লাগা। ১৯৪৪ সালে কলকাতা পোর্টে ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ শুরু। কিন্তু ভাগ্য যাঁকে লিখে দিয়েছিল চলচ্চিত্রের অগ্রণী এক পথিক হিসেবে, সেখানে এই চাকরি কিভাবে তিনি চালিয়ে যাবেন? হলও তাই। ‘কামনা’, ‘সহযাত্রী’, ‘ওরে যাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’—টানা ফ্লপের কারণে তাঁকে একটা সময়ে প্রযোজকেরা নিতেই চাইতেন না। তাঁর নামের পাশে বসে গিয়েছিল ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমা। কিন্তু কোনো দিনই ধৈর্য হারাননি। তাঁর মূলধন ছিল ধৈর্য আর বিনয়। অভিনয়ের সময় তিনি ছিলেন ছাত্রের মতো। অভিনয় শেখার প্রতি ছিল অবিচল নিষ্ঠা। ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ দিয়ে আলোর দেখা পান উত্তম। ১৯৫২ সালেই পোর্ট কমিশনার্সের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি মনোযোগ দেন অভিনয়ে। 'সাড়ে চুয়াত্তর' এর পর তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দর্শকদের ভালো লাগাকে মুগ্ধতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তখনকার বাংলা সিনেমার ছিল না। ঠিক এই পটভূমিতে আসে অগ্রদূতের পরিচালনায় ‘অগ্নিপরীক্ষা’। নায়ক উত্তমকুমার, নায়িকা সুচিত্রা সেন। প্রায় ম্যাজিকের মতো ফল পাওয়া যায় এই সিনেমা থেকে। নায়ক থেকে মহানায়কের শীর্ষ আসনটিতে উত্তরণের সঠিক যাত্রারম্ভ হয় অগ্নিপরীক্ষা থেকে। বাঙালি দর্শক তাঁদের আইডিয়াল একজন রোমান্টিক হিরোকে খুঁজে পান উত্তমকুমারের মধ্যে। বক্স অফিসের নিশ্চিত গ্যারান্টি হয়ে উঠলেন। একটানা সাফল্যের জয়রথটা সাময়িকভাবে কখনো যে একটু থমকে দাঁড়ায়নি, এমন নয়। কিন্তু সেই থামাটা পথের ওপর দাগ না ফেলতেই জয়রথ আবার গতি পেয়েছে। বিশেষ করে বম্বে গিয়ে তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু 'অমানুষ' তাঁকে সেখানেও ফের শিখরে তুলে দেয়।
শেষ ছবি 'ওগো বঁধু সুন্দরী' ছবির শুটিং করতে করতেই তিনি ইহলোক পরিত্যাগ করেন। ১৯৮০। আমরা তখন বিহারের ঠাকুরগঞ্জের 'এলার্পী'- র বাড়িতে (এলার্পী জায়গাটার নাম এখন পাল্টে গিয়েছে কি না তা বলতে পারব না)। কিছুই তেমন মনে নেই। আমার বয়স তখন ৬/৭। মা সেই সময় 'নবকল্লোল' পড়ত। আর আমাদের জন্য আসত 'চাঁদমামা'। মনে আছে মা- এর জন্য বাবা সেই সময় 'আনন্দলোক' জোগাড় করেছিল। বইটা সেই সময় আমার নজর কেড়েছিল শুধু নতুন ধরনের ম্যাগাজিন (গল্পের বই) হিসেবে। আর সিনেমাটার কথা সেই সময়েই মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। কারন বহুবার আলোচিত হয়েছিল বাবা- মায়েদের কথাবার্তায়- গল্পের সময়। ছবি মুক্তির পর শিলিগুড়িতে গিয়ে মা সিনেমাটা দেখেছিল। বাবাও দেখেছিল হয়ত। মনে নেই। উত্তম কুমার মা- এর একেবারে এক ও অদ্বিতীয় নায়ক ছিল সর্বদা। শিলিগুড়িতে সুমন কাকুদের বাড়িতে গিয়েছিলাম আমরা। কাকিমাও বোধহয় দেখতে গিয়েছিল সিনেমাটা। তাও মনে নেই। তবে আমরা ছোটরা যাইনি। সেই সময় আমরা সিনেমা দেখার অনুমতি পাইনি। উত্তম কুমারের সিনেমা প্রথম আমি দেখার অনুমতি পেয়েছিলাম ক্লাস ইলেভেনে উঠে। বাড়িতে টিভি আসার পর। তার আগে কোথাও হয়ত দেখেছিলেম, তা আমার মনেও দাগ কাটেনি, আর আত্মীয়দের বাড়িতে সকলের সঙ্গে ভয়ে কাঁটা হয়ে বসে দেখতে হয়েছিল হয়ত। তবে তার আগে আমি সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন দেখে নিয়েছি, ছোটখাটো স্পেশাল ফিল্ম হিসেবে আগত আমাদের ইসলামপুরের ততোধিক ছোট হলে। ফলে সেই সিনেমাগুলো মনে বেশি দাগ কেটেছিল। উত্তম কুমারকে চিনেছি আস্তে আস্তে। যত দিন গেছে, তত অভিনয়ের গভীরতা এবং ক্যারিশমা দুইই উপলব্ধি করেছি।
অত কম বয়সেই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায়না এ হেন কিংবদন্তির। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে আমাদের আরও কত উপহার দিতেন তা আন্দাজ করাই যায়। উত্তমের স্টারডম বাংলা ছবিকে শুধু যশ আর অর্থই দেয়নি, উত্তমের স্টারডম বাংলা ছবির নেশায় পরিণত হয়েছিল। বার বার বাংলা ছবি চেষ্টা করেছে উত্তমকে তার পরিসরে আটকে রাখার, আর বার বার উত্তম সেটা ভেঙে বেরিয়ে তৈরি করেছেন স্টারডম আর অভিনয়ের এক অননুকরণীয় যুগলবন্দি। তাই তাঁর মৃত্যু বাংলা ছবিকে শুধু দরিদ্র করে দেয় না, নিঃস্ব করে দেয়। সেই কারণেই উত্তমহীন বাংলা ছবি আর বাংলা ছবি রইল না, ৮০ র দশকের পর তা খেই হারিয়ে ফেলল। তবে রয়ে গেল তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্রেরা, তাঁর অননুকরণীয় অভিনয় এবং ক্যারিশমা- যা বাংলা তথা বাঙালির সম্পদ হয়ে থাকবে, যতদিন বাংলা চলচ্চিত্র থাকবে, ততদিন।