
স্বর্ণালী গোস্বামী
5 Apr 2026
তথাকথিত সেলিব্রিটি সুলভ খোলস থেকে বেরিয়ে এসে সকলের সঙ্গে মিশলে, সকলের কথা ভাবলে, আজও মানুষ কাঁদবে তোমার শোকে
সারা দিনটা আলসেমিতে কাটালাম। সন্ধ্যেবেলা টুক করে বাজার সারলাম। বাড়িতে মেয়ের সঙ্গে খানিক ভাট বকলাম। তারপর রাতের সব কাজ সেরে বসলাম। ভেবেছিলাম সন্ধেতেই লেখাটা সেরে ফেলব। কিন্তু হয়ে উঠলনা। তাই এখন। লিখতে বসে ল্যাপটপ খুলে আবার হাতে মোবাইল নিয়ে স্ক্রোল করলাম খানিক। বিভিন্ন মানুষের মন্তব্যে চোখ বোলালাম। গত সারা সপ্তাহেই আমার নজর ছিল মোবাইলে ফেসবুক তথা পোর্টালের বিভিন্ন খবর/ লেখায়। মনের মধ্যেও চলেছে সারাক্ষণ একই বিষয়ের ভাবনা। কাজকর্ম তো করতেই হবে, যা নিত্যনৈমিত্তিক করতে হয়, কিন্তু তার মধ্যেও যে মনে বিভিন্ন ভাবনা আসে, তার বেশিরভাগটাই জুড়ে ছিল রাহুল অরুণোদয়।
গত রোববারের পর একটা খবরও করিনি আমার খবরের জায়গায়। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, রোববার আড্ডার পাতায় যখন শুরুটা হয়েছে, পরের পর্বটাও সেখানেই করব। সোমবারই ঘটনা সম্পূর্ণ অন্যদিকে মোড় নেয়, যা আমি আমার লেখায় শেষের দিকে প্রশ্ন দিয়ে শেষ করেছিলাম, তার অনেকটাই মিলে যায়। রাহুল নিজে থেকে সমুদ্রবিহারে যাননি। কাজের সূত্রেই গভীর জলে যেতে হয়েছিল। সারা দিন টিভির পর্দায় উত্তেজিত নিউজ অ্যাঙ্কর তা বলে গেলেন, বলা ভালো কি হয়েছে, কি হয়েছে আঁতিপাতি খোঁজার ভান করে গেলেন। তবে টালিগঞ্জের অভিনেতাদের মতো সাধারণ মানুষরাও জলের মত পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, এটা ৯৯% গাফিলতির ব্যাপার। ১% অ্যাক্সিডেন্ট। আমি তো আর একটু এগিয়েই ভাবছি। পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে রাহুলকে। কে কি ভাবল, আমার এই সিদ্ধান্তে, তাতে আমার কিছু যায়- আসে না। সব কিছু দেখে শুনে আমার এটাই বদ্ধপরিকর হয়েছে মনে। তবে এটা প্রমাণ করার কোনও জায়গা নেই। শুধুই ধারণা মাত্র। কাজেই বদ্ধমূল ধারণা বলাই ভালো। আসলে এভাবেই আমি শান্তি পাচ্ছি। একে একে দুই করতে পারছি।
প্রত্যেকের মনে যে ক'টি প্রশ্ন আসছে- সেদিন ঠিক কী হয়েছিল? প্রথম বক্তব্যে কেন এলো, রাহুল এবং শ্বেতা বোটে সমুদ্রে ঘুরতে গিয়ে বোট উল্টে পড়ে গেছেন। এমন খবর কেন হল? প্যাক আপ হয়ে গিয়েছিল, সবাই ফিরে গিয়েছিলেন, রাহুল থেকে গিয়েছিল- কেন বলা হল? পারফেকশনিস্ট রাহুল নিজে থেকে ড্রোন শট রিটেক করতে বলেছিলেন- কেন বলা হল? দুইজনেই জলে পড়লেন, শ্বেতা স্বাভাবিক সুস্থ থাকলেন, রাহুল অসুস্থ না হয়ে একেবারে মারা গেলেন কেন? প্রোডাকশনের তরফে যে নুলিয়াকে রাখা হয়েছিল, তাকে টাকা দিয়ে বলানো হল কেন, রাহুলকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে আরও ১০ জন উপস্থিত থেকে উদ্ধার কাজে সহায়তা করলেও তাঁকে বাঁচানো যেত না? পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছে, এক ঘন্টার বেশি জলের মধ্যে ছিল রাহুল, কেন অত সময় লাগলো উদ্ধার করতে, তার কোনও সদুত্তর নেই কেন? সর্বোপরি তিনটে ভিন্ন মত কেন, এবং অনুমতি না নিয়ে সমুদ্রের জলে শুটিং করা ও ড্রোন চালু থাকার প্রমাণ পাওয়া- যা প্রোডাকশনের তরফ থেকে একেবারেই স্বীকার করা হয়নি। কেন?
রাহুল বামপন্থী মনোভাবাপন্ন ছিলেন। এবং তা সর্বসমক্ষে জানাতে এতটুকুও কুন্ঠা বোধ করতেন না। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের দৃঢ় মতামত ব্যক্ত করতেন। কাজ পেতেন না। পরিচালক পারমিতা মুন্সি বলছেন, তিনি জেনেছেন, স্ক্রিপ্টেই ছিল সমুদ্রে বিলীন হওয়ার কথা! সিরিয়ালের নায়িকার জীবনে ফিরে আসবে পুরোনো প্রেমিক! তাহলে??? কোথায় কী হচ্ছে? কী ঘটেছে? কেন? যে মানুষটা মরে গেল, তার ঘাড়ে দায় চাপিয়ে নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা কেন? এটা ক্রিমিনালের মত আচরণ নয়? পড়ছিলাম, পারমিতা খুব সুন্দর করে নিজের প্রোফাইলে পোস্ট করেছেন। গুছিয়ে লিখেছেন, সঠিক পরিস্থিতি। স্বরূপ বিশ্বাস জানতেন না, জানা সম্ভব নয়- হতেই পারে। কিন্তু ওই যে- আমি নিজে শান্তি পাচ্ছি এটা পরিকল্পিত হত্যা সেটা ভেবে! ফেসবুকেই কিছু অর্বাচীন এমনটা বলছে। সামনে ভোট। এবারের ভোট অন্যান্যবারের মত হবেনা। টক্কর হচ্ছে রীতিমত। আমার মনে হচ্ছে, সরকার পাল্টালেও অবাক হওয়ার মত কিছু হবেনা। সেখানে ক্যাটর ক্যাটর একটি মানুষ যদি খানিক বেশিক্ষণ জলের তলায় থাকে, থাকুক। আমাদের সুযোগ হলে তুলব'খন। - এমনই মনোভাব ছিল সেদিন তালসারিতে। কেউ প্রকাশ করছিলনা। কিন্তু প্রত্যেকেই এমনটাই ভাবছিল। তৃণমূল- বিজেপি মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। একজন দুর্নীতির কারবারি আর একজন ধর্মের কারবারি। বাম মনোভাবাপন্ন, বিশেষ করে উচিত কথা মুখের ওপর বলে দেওয়ার মত মানুষ রাহুল- দুই পক্ষেরই চক্ষুশূল ছিলেন। যদিও সামনাসামনি তা তো এড়িয়ে যাওয়া যেতনা, তাই সেদিন সকলেই বেশ উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। এবারে মরে যাবে সত্যি সত্যি- তা বোধহয় কারো মাথায় আসেনি। সেখানেই ঘেঁটে গেছে সব। তার ওপর এই মৃত্যু নিয়ে যে এভাবে তোলপাড় হবে- তা তো প্রোডাকশনের কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। কাজ না পাওয়া একটা ছেলে, চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলা একটা ছেলেকে নিয়ে যে সমাজের অন্তঃস্থল থেকে তোলপাড় হয়ে যাবে, তা ভাবনাতেও ছিল না লীনা গাঙ্গুলির। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।
গতকাল আর্টিস্টস ফোরামের তরফে রিজেন্ট পার্কে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে প্রোডাকশন হাউজের বিরুদ্ধে। গোটা টলিপাড়া রাস্তায় নেমে মিছিল করেছে টেকনিশিয়ান স্টুডিও থেকে রাধা স্টুডিও অব্দি। রাতে তালসারিতে গিয়ে প্রিয়াঙ্কা এফআইআর দায়ের করে এসেছেন। আজ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সমস্ত কাজ বন্ধ থাকবে টলিপাড়ায়। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রধানমন্ত্রীকে আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে প্রতিদিন অগুন্তি প্রতিবাদী লেখা/ ভিডিও তো রয়েইছে। এবারে দেখার, কী হচ্ছে। কতদূর গড়াচ্ছে বিষয়টা। প্রশ্নগুলোর উত্তর আদৌ পাওয়া যাচ্ছে কি না। কতদিনে ঘটনার তদন্তের সুরাহা হচ্ছে। প্রোডাকশন হাউজের বিরুদ্ধে কেমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শুটিং এ ডাক্তার সহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে কি না।
তবে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু সমস্ত শিল্পীদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে গেলেন। নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে গেলেন কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা কাকে বলে। শিখিয়ে গেলেন, শিরদাঁড়া সোজা থাকলে, কাজ না পেলেও মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনা কেউ। বাঁধভাঙা কষ্ট মানুষের মনে আসবেই যদি সৎপথে থাকা যায়, সকলের ভালো চাওয়া যায়, সকলের সঙ্গে মিশতে পারা যায়। তথাকথিত সেলিব্রিটি সুলভ খোলস থেকে বেরিয়ে এসে সকলের সঙ্গে মিশলে, সকলের কথা ভাবলে, আজও মানুষ কাঁদবে তোমার শোকে।