
স্বর্ণালী গোস্বামী
11 Oct 2026
পুজোর মেজাজ চারদিকে, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার যেন কেটে যাচ্ছে
দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেছে। পুজোর মেজাজ চারদিকে। হচ্ছেও। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার যেন কেটে যাচ্ছে। গতকাল ইডেনে একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের শারদীয়া দূর্গা পুজোর উদ্বোধন করা হল রাজ্য সরকারের তরফে। পাশাপাশি দিল্লিতে চলল জরুরি অবস্থার মত ধর- পাকড়। ভাবতে বসলে পুজোর আনন্দ মাটি হয়ে যায়, আবার এই এত বড় ঘটনা নিয়ে কিছুই না ভাবলে মানুষ হিসেবে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে চূড়ান্ত অমানবিক হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে হয়। তাই আমার মনে হয় এই মুহূর্তে একেবারে অতি উগ্রবাদী ছাড়া প্রত্যেকেই এই দোলাচলে ভুগছেন।
গত সপ্তাহে আরও একটি দুঃসংবাদ আপামর ভারতবাসীকে সক্কাল সক্কাল হতভম্ব করে দিয়েছিল। নানা পাটেকারের মৃত্যু। হঠাৎ করে তাঁর মৃত্যু বেদনাদায়ক তো ছিলই, তার পাশাপাশি বেশিরভাগ মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক তৈরী করেছিল, আদৌ কী এটা স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল? তবে আজকে পাওয়া ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী কার্ডিয়াক অ্যারেস্টেই নানার মৃত্যু হয়েছে। নানা পাটেকর ছিলেন একজন আদ্যোপান্ত নির্ভেজাল মানুষ। অতি উচ্চ মানের অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সমাজের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। জীবন কাটাতেন একেবারে সাধারণ মানুষের মত, সাধারণ মানুষের সাথে। তাঁর অভিনীত বিভিন্ন চরিত্র কিছু না কিছু শিক্ষা দিয়ে যায় আমাদের। পাশাপাশি এই সপ্তাহেই মৃত্যু হয়েছে জনপ্রিয় নিউজ অ্যাঙ্কর পাপিয়া সিংহ- র। সংবাদমাধ্যমের বলিষ্ঠ একজন মানুষকে আমরা হারিয়েছি।
তারপর মহালয়ার আগের দিন থেকেই দিল্লি খবরের কেন্দ্রে। নির্বাচন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন বিরোধী দলগুলি এবং সিজেপি র তরফে বৃহৎ জনসমাবেশের ডাক দেওয়া হয় ১০ অক্টোবর। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে দিল্লি কার্যত স্তব্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ট্রেন, মেট্রো সহ বিভিন্ন পরিবহন ছাড়াও ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১০ তারিখ মহালয়ার দিন সকাল থেকেই একে একে বাড়ি থেকে, ফ্লাইট থেকে হাইজ্যাক করে আটক করা হয় সিজেপি র নেতা সহ সমাজের সব স্তরের মানুষজনকে। আটক করা হয় বিরোধী দলনেতাদেরও। ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরী করে সেখানে নিয়ে হয় প্রায় ৭০০০ আটক করা আন্দোলনকারীদের। কেন এমন করা হবে? গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আন্দোলন করার অধিকার কেন থাকবেনা?
পুলিশ বলছে, জুলাই মাসে আন্দোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আন্দোলনকারীরা ইট, পাথর ছুঁড়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নষ্ট করেছিলেন, তাই সেবার দিল্লি পুলিশকেও লাঠি চালাতে হয়েছিল। সেই জন্য এবারে অনুমতি দেওয়া হয়নি। দিল্লি পুলিশের ডিসিপি নেহা যাদব জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে, উদ্যোক্তাদের নিয়ম না-মানার নজির স্মরণে রেখে ধর্নার বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু সেবার ও তো বলা হয়েছিল, কোনও লিখিত অনুমতি নাকি চাওয়া হয়নি সিজেপি-র পক্ষ থেকে! তাহলে? কোনটা ঠিক? গতকাল পুলিশ বিবৃতি দিয়েছিল সময় মেনে অনুমতি নেওয়া হয়নি। আজকে অন্য কথা! বার বার এভাবে কেন আন্দোলন দমিয়ে রাখা হবে? রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে অব্দি দেশের এমন ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। দমননীতি ব্যবহার করে কী আন্দোলন আটকে রাখা যায় বলে আমাদের দেশের বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী তথা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনে করেন? প্রাক্তন আইএএস, তথা অবসরপ্রাপ্ত আমলা জহর সরকারও বলছেন দ্বর্থহীন ভাষায়- ভোট নিয়ে, এসআইআর নিয়ে অনিয়ম হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করেছেন নির্বাচন কমিশনার। তিনি নিজেও একসময় নির্বাচন পরিচালনা করেছেন। তিনি যে বলছেন? তাহলে কোন হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকার আন্দোলন দমিয়ে রাখছেন?
অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন কেন্দ্র সিদ্ধান্তের। কিন্তু সেটা কী ঠিক হচ্ছে? সমস্যা তো আছে। তার সমাধান করতে হবে। দমনমূলক নীতি অবলম্বন করে সমস্যার সমাধান হয়না। শুধু সমস্যা থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকা হয়। দেহসে প্রচুর সমস্যা আছে। সেগুলো স্বীকার করতে হবে। তার সুরাহা করতে হবে। কাল দু- তিনটে রিল দেখছিলাম। ধ্রুব রাঠী নাকি বিদেশী। ভারতের পাসপোর্ট নেই তার। সকলে আহ্লাদিত হয়ে পোস্ট করছেন। ঠিক হয়েছে! এবার বোঝো, কাকে বলে ভারত সরকারের সঙ্গে পাংগা নেওয়া! তার মধ্যে আমাদের পরিচিত সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ও রয়েছেন। তিনি সম্ভবত সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা পোস্ট করেছিলেন। আজকে ধ্রুব রাঠির নিজের করা লাইভ এল আমার ফিডে। তাতে তো তিনি নিজের পাসপোর্ট দেখিয়ে দিলেন। বললেন, ঘুম থেকে ঠেলে তুলে ছেচড়াতে ছেচড়াতে তাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে বন্দি করা হয়েছে। তাঁর কথায় কিডন্যাপ করা হয়েছিল। কেন হবে এরকম? আওয়াজ তো তুলতে হবে বিভিন্ন অনিয়মের। নতুন ভারত ঠিক পথেই এগোচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার যদি ভাবে এভাবে চলে সরকার টিকিয়ে রাখাই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য, তাহলে দেশ জ্বলবে অচিরেই। এই জনরোষ কিন্তু দিনদিন বাড়বে বই কমবে না। শুরু হতে পারে গৃহযুদ্ধ। সময় থাকতে থাকতে সিদ্ধান্ত নিন।
নতুন ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেলেন প্রকাশ রাজপুরোহিত। গত বছরের ২৪ জুন এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে কমিশনের নথিতে সই ছিল সঞ্জয়ের। কিন্তু মেয়াদ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই গত অগস্টে কমিশনের কাজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তাঁকে। এ বার সেই সঞ্জয়ের জায়গায় নিয়ে আসা হল প্রকাশকে। মিডিয়ার করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার সঞ্জয় ছিলেন কমিশনের ভোটার তালিকা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বে। ২০২৪ সালের অগস্ট থেকে চলতি বছরের অগস্ট পর্যন্ত এই দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। আবার গত বছরে ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার থেকে ডেপুটেশনে কমিশনের কাজে যুক্ত হন সীমা খন্না। তিনি কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ডিজিটাল পরিকাঠামো-সহ সব ধরনের ডিজিটাল পরিকাঠামো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন। কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন দুই কমিশনার সুখবিন্দর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমার ভূমিকা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন সঁধু। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কাজকর্ম নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের দায়িত্ব থেকে সঞ্জয়কে সরানোর সিদ্ধান্তে আপত্তি ছিল সঁধুদের। নতুন ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের কার্যকালের মেয়াদ থাকবে ২০৩০ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত।