top of page

মাতৃভাষার কান্ডারি, রয়ে যাবেন সকলের হৃদয়ে

স্বর্ণালী গোস্বামী

21 Feb 2026

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আবহে তাঁর চলে যাওয়া যেন মাতৃভাষাকে আভূমি প্রণাম করার সামিল

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। গতকালই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন সকলের প্রিয় লেখক শংকর বা মণি শংকর মুখোপাধ্যায়। তাই ভাবলাম আজই না হয় একটু গল্প করা যাক! রোববারে ব্যাপারটা বাসি হয়ে যাবে। গতকাল এসআইআর নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর থাকায় শংকরকে নিয়ে ইচ্ছে থাকলেও লিখতে পারিনি। কিন্তু রোব্বাবারটা একটু বেশিই দেরি হয়ে যাবে।

আমাদের মাতৃভাষা দিবস আন্তর্জাতিকতার স্বীকৃতি পেলেও তার কৃতিত্ব তো আমাদের বাঙালিদেরই। সে পাশের রাষ্ট্র হোক না কেন। আল্টিমেটলি বাঙালিদের আন্দোলনের ফলস্বরূপ সারা বিশ্বে একটি দিন পালিত হয় নিজেদের মাতৃভাষা সেলিব্ৰেট করার জন্য। আমি ইচ্ছে করেই মাঝে মধ্যে ইংরিজি রাখছি লেখার মধ্যে। সম্পূর্ণ বাংলায় লিখতেই পারতাম, সে দক্ষতা নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু আজকাল কথা বলার সময় আমরা অতি বাঙলাভাষী প্রিয়রাও ইংরিজি শব্দ ব্যবহার করা থেকে নিজেদের আটকে রাখতে পারিনা। তাই শব্দের গুরুত্ব বোঝাতে ইংরিজি শব্দের ব্যবহার।

শংকর বাংলাভাষায় লেখা লেখকদের মধ্যে সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি ছিলেন। নিজের সময়ের লেখকদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছেন কি পাচ্ছেন না, তাই নিয়ে আমার মনে হয় না তাঁর মধ্যে খুব সাংঘাতিক কষ্ট ছিল। একটু খারাপ লাগা তো থেকেই, কিন্তু তাই বলে তাঁর কলম থেমে থাকেনি। থেমেই থাকেনি শুধু নয়, রীতিমতো গড়গড়িয়ে চলেছে। বহুদিন পর্যন্ত। বহু গল্প/ উপন্যাস নিয়ে সিনেমা হয়েছে। রীতিমতো সত্যজিৎ রায় তাঁর লেখা নিয়ে ছবি বানিয়েছেন, যা দর্শকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে। তাছাড়া তাঁর লেখা 'চৌরঙ্গী' তো রীতিমতো সাড়া জাগানো একটি উপন্যাস। আমাদের এই বইটি ছিল। মনে আছে দূরদর্শনে দেখেছিলাম 'নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি'। এছাড়া প্রতি পূজাবার্ষিকীতে (দেশ) শংকরের লেখা পড়তামই। আমার মায়েরও প্রিয় লেখক ছিলেন শংকর।

মাতৃভাষা দিবসের ঠিক আগের দিন এভাবে তাঁর চলে যাওয়া আরও বেশি করে বাংলা ভাষার প্রতি টান অনুভব করায়। আজকাল বাংলা ভাষা নিয়ে যেমন গেল গেল রব, তেমনটা সেই সময় ছিলনা। তখন রমরমা ছিল বাংলা বইয়ের বাজার। তার ওপর তাঁর এমন সাধারণ মানুষদের নিয়ে সাধারণ মানুষদের জন্য লেখা তাও সাধারণ ভাবে, অথচ সেই লেখার গভীরতা ছিল প্রশ্নাতীত। শংকরের লেখার বিষয়বস্তুও ছিল একটু অন্যরকম। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন তিনি। তাঁর আধ্যাত্মিক বইগুলিও সমাদৃত হয়েছে পাঠকদের মধ্যে।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক শংকর সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই পেয়েছেন সাফল্য। তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। ‘কত অজানারে’ দিয়েই পাঠক মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন শংকর। পরে চৌরঙ্গি, সীমাবদ্ধের মতো একাধিক উপন্যাস তাঁকে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর দু’টি উপন্যাস, ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন-অরণ্য’ চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে সত্যজিতের মাধ্যমে। এই দু’টি উপন্যাস এবং ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর ট্রিলজি, স্বর্গ মর্ত পাতাল। তাঁর লেখায় কলকাতা একটি জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছিল। বিমল মিত্রের পরে শংকর নামটি হয়ে দাঁড়ায় ‘বেস্ট সেলার’ এক লেখকের নাম, একের পর এক বই সংস্করণের পর সংস্করণ অতিক্রম করতে থাকে।

তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায় কলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে। বারওয়েল সাহেবের কাছে কাজ করার সময়েই তাঁর সামনে উন্মোচিত হয় কলকাতা হাই কোর্ট, অফিসপাড়া এবং তার অন্তরালবর্তী জীবনপ্রবাহ। এই প্রবাহকেই নিজের লেখার রসদ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন তিনি। কর্মজীবনে বাংলার অন্যতম প্রধান বণিকগোষ্ঠীর জনসংযোগের দায়িত্ব সামলেছেন। পরবর্তী কালে কর্পোরেট জগতে তিনি এক বিশিষ্ট নাম হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই সব কিছু সামলিয়েও লিখে গিয়েছেন নিরন্তর। ১৯৯৩ সালে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার, ২০২১ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ২০২২-এ এবিপি আনন্দ তাঁকে ‘সেরার সেরা বাঙালি’ সম্মান প্রদান করে।

বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছিলেন নবতিপর লেখক। তার মধ্যেই গত ডিসেম্বর মাসে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল মণিশংকরের। সেই সময়ে তাঁকে ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। ফের একাধিক শারীরিক সমস্যা নিয়ে দিন পনেরো আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষীয়ান সাহিত্যিক। সেই সময় খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। ঝিমিয়ে পড়েছিলেন তিনি।

তবে যা দিয়ে শুরু করেছিলাম, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আবহে তাঁর চলে যাওয়া যেন মাতৃভাষাকে আভূমি প্রণাম করার সামিল। সাধারণ মানুষের অসাধারন এই লেখক বাংলা ভাষার এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে রয়ে যাবেন আমাদের হৃদয়ে এবং অবশ্যই তাঁর লেখা রয়ে যাবে আমাদের মননে।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page