
স্বর্ণালী গোস্বামী
2 Aug 2026
এরা এদের মতোই বিদ্রোহ করছে। এদের ধৈর্য নিয়ে শেখাতে হবে। কাছে টেনে আশ্বাস দিতে হবে। আত্মীয়ের মতো বোঝাতে হবে। এদের অবহেলা করলে বিপদ বাড়বে বৈ কমবেনা
রাজ্যের জঙ্গি যোগ নিয়ে এখন জোর চর্চা। কিন্তু আমি ভাবলাম গত দুই সপ্তাহের বিষয় নিয়ে একটু অন্যভাবে বিশ্লেষণ করি। 'ককরোচ জনতা পার্টি', নতুন একেবারে টাটকা এই দল। যার জন্মই হয়েছে ঘৃণা থেকে। দেশের শীর্ষ আদালত- যেখানে আমরা সুবিচারের আশায় শেষ ধাপে যাই, সেখানেই বিচারপতি, প্রধান বিচারপতি- দেশের চাকরিহীন বেকারদের আরশোলার মত কীটের সঙ্গে তুলনা করলেন! আমরা বলি, নিজেদের মধ্যে বলি, আত্মীয়- বন্ধু- বান্ধবদের সঙ্গে বলি। কিন্তু এভাবে আদালতে একজন বিচারপতি গোটা একটা প্রজন্মকে এভাবে অপমান করতে পারেন? তার শাস্তি কে দেবে? এটা অবমাননা নয়???
আমি নিজেই তো গুরুত্ব দিইনি শুরুতে। কারা না কারা পার্টি করল, তাতে আমার কি? নতুন করে আবার দুর্নীতি করার অপশন পাবে কিছু লোকজন। চাকরি- বাকরি নেই, এইভাবে করে খাবে। কিন্তু এই অপমান গায়ে মেখেছিল এই প্রজন্ম। নিমেষের মধ্যে দল গঠিত হয়ে গেল। দেশের চারদিকে জ্বলন্ত ইস্যু রয়েছে, যেগুলোর কোনও সমাধান হচ্ছেনা। বিরোধীরা এককাট্টা হয়ে আওয়াজ ও তুলতে পারছেনা। কারন একদা বিরোধী কবে যে সরকারে আসীন দলের চামচাগিরি করতে শুরু করে দেবে, তা স্বয়ং ভগবানও বোধহয় জানেনা। এই কীটগুলো কিন্তু পারল। আওয়াজ তুলল। এরা কিন্তু ক্রিমিনাল নয়। কাঁড়ি কাঁড়ি দুর্নীতি মাথায় নিয়ে হামবড়া ভাব নিয়ে আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছেনা। আমরা তাদের কাছে হেঁ হেঁ করে হাত কচলাতে কচলাতে নিজেরটুকু বুঝে নেওয়ার জন্য হাতও পাতছিনা। সমাজের আবর্জনা মনে করে দুরে ঠেলে রেখেছি। কিন্তু আদৌ কোনওদিন ভেবেছি কি, কতদিন এভাবে আবর্জনা সরিয়ে রাখা যায়? একদিন না একদিন গন্ধ তো বেরোবেই। এই প্রজন্ম হল আমাদের পচে যাওয়া সমাজের পুঁতিগন্ধময় সেই আবর্জনা।
মনে রাখতে হবে, এদের এখনও মনে স্বপ্ন আছে। দুনিয়া পাল্টে দেবার ইচ্ছে আছে। হাতের মুঠোর মধ্যে দুনিয়াকে নিয়ে নেওয়ার সংকল্প আছে। রাস্তা ঠিক নেই। ঠিক কি, কি নীতি মেনে বিপ্লব করতে হয়, ঠিক কতটা চেঁচালে অসভ্য হওয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তা এরা, সমাজের বখে যাওয়া এই নতুন প্রজন্ম শেখেনি। আমরা একটু নিজেদের দিকে আঙুল তুলি? আমরা কি আদৌ শিখিয়েছি? আমরা কী শিখিয়েছি? আমরা শিখিয়েছি, শুধু নিজের ভালোটা বোঝো, শুধু নিজে খাও, শুধু নিজে বাঁচো। যেভাবে হোক। আর কী? যেভাবে হোক পয়সা রোজগার কর। যেভাবে হোক। বর্তমানে চারদিকে শুধু পয়সা আর পয়সার খেলা চলছে। কেউ অস্বীকার করতে পারবেন? গ্রামের গরিব বড়লোক হতে চায়। মফস্বলের নিম্ন মধ্যবিত্ত বড়লোক হতে চায়। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীই তো উঠে গেছে। সবাই বড়লোক। যাদের টাকা আছে, তারা আরও টাকা চায় আরও আরও, আরও... শেষ নেই।
একটি শিশু ছেলে হলে জ্ঞান হয়ে থেকে শোনে বড় হয়ে রোজগার করতে হবে। অনেক টাকা। মেয়ে হলে শোনে বড় হলে বিয়ে করতে হবে অনেক বড়লোকের বাড়িতে। গ্রাম থেকে মফস্বল থেকে শহর, সর্বত্র এক শিক্ষা। স্কুলে যাওয়ার অবস্থা থাকলে শুরু থেকেই ল্যাং মারা শেখানো- ও পারছে, তুই পড়া পারছিস না কেন? মায়েদের মধ্যে চলে চুলোচুলি। দেখছে ছেলে- মেয়ে। রেজাল্ট বেরোলে ফার্স্ট হলিনা কেন? শুরু হলো উদোম পেটানো। এত করলাম সারা বছর ধরে, তাও ফার্স্ট হলোনা? ভেবে দেখবেন, যে মেয়েটা বা ছেলেটা ফার্স্ট হল, সেই বছর সে বাদে আর সবকটা মার খেলো মা অথবা বাবার কাছে। সবাইকেই ফার্স্ট হতে হবে। তখন থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে সমাজের বাঁয়ে এলিয়ে দেওয়ার গল্প। তার, অর্থাৎ যে ফার্স্ট হতে পারল না, মনের কি অবস্থা- তা কেউ ভাবছে না। সে কি আদৌ সিরিয়াসলি নিচ্ছে, নাকি তখনই আড়াল হতেই ফিক করে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে- মা কিংবা বাবা তা জানার চেষ্টাও করল না কিন্তু। শুরু হয়ে গেল বড়দের গাফিলতি। আমাদের দায়িত্ব আমরা কি পালন করতে পারলাম। সন্তানকে পেট থেকে বের করে দিলেই চিন্তা শেষ? মানুষ করার দায়িত্ব কে নেবে? হরিদাস পাল? শুধু জ্ঞান দেওয়া আর পেটানোই মানুষ করার মূল মন্ত্র? তাদের মনের হদিস কে নেবে? বললে সকলে রে রে করে তেড়ে আসবে। আমরা সংসার- চাকরি সম্পর্ক নিয়ে এমনিতেই ল্যাজে- গোবরে হয়ে আছি, তাও নাকি ওই সব পুঁচকেগুলোর মনের হদিস নিতে হবে! যা বলব, তাই করবে। আবার কি? আমরা করিনি? বুকে হাত রেখে বলুন তো দেখি- সত্যি সত্যিই কি আদ্যোপান্ত বাবা- মায়ের বাধ্যটি হয়ে এতকাল এই গোঁয়ার্তুমি করা একজন মানুষ হয়েছেন? কোনও বাড়িতে বাড়ির মায়ের আস্ফালন চলে তো কোথাও বাবার। এটাই দস্তুর। কিন্তু গল্প সব বাড়িতে এক।
এবারে যে ফার্স্ট হল, বিভিন্ন স্কুলে ফার্স্ট হতে হতে যে ছেলেটি বা মেয়েটি এগোচ্ছে, বোর্ডে ভালো রেজাল্ট করল। চলো জয়েন্ট দাও, আইআইটি দাও, নিট দাও। তবেই তো এই মেধার যথার্থ দাম হবে। কার মেধা? কে দাম দেবে? সেই মেধার পেছনে মায়ের অবদান কী? চারদিকে দৌড়ে দৌড়ে নোটস জোগাড় করা। সবচেয়ে ভালো টিউটর, অবশ্যই প্রাইভেট টিউটর জোগাড় করা। প্রতিদিন সকালে মেয়েকে ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া। খাইয়ে দেওয়া, জুতো পরিয়ে দেওয়া, রাত জেগে জেগে নিজে পড়ে পড়ে ছেলে/ মেয়েকে শুনিয়ে শুনিয়ে পড়া মুখস্ত করিয়ে দেওয়া। ঘুম পেলে রাতে কফি করে দেওয়া- ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। তার পড়তে ইচ্ছে করছে কিনা, একটু বিশ্রামের প্রয়োজন আছে কি না, তার খোঁজ নিই আমরা ক'জন? ওদিকে বাবা দিনান্ত খাটা খাটনি করে স্কুলের ফি, টিউশন ফি জোগাড় করতে করতে মুখে রক্ত তুলে ফেলা। যারা তারপরেও সেই মুখস্ত বিদ্যা সম্বল করে বাবা- মায়ের হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, তারা কিন্তু দেখছে, মা কিভাবে অন্য মায়েদের সঙ্গে ঝগড়া- ঝাঁটি করে নোটস বা টিচার জোগাড় করছে। কিভাবে চুপি চুপি কাউকে কিছু না জানিয়ে টিচারদের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে। বাবা কিভাবে তার কলিগদের খিস্তি মেরে আখের গোছাচ্ছে, সমানে অন্যের নামে মিথ্যে প্ৰচার করে নিজে ভালো সাজছে। এই দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে সেই সন্তান। এবারে বড় হয়ে হয় সে সেই বদ গুণগুলো শিখবে এবং সমাজে নিজেদে ভদ্র হিসেবে প্রতিপন্ন করবে, অথবা সে সেগুলো ভুল কাজ বা দোষের কাজ বুঝে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে।
আমরা আমাদের সন্তানদের তাদের মত করে বড় হতে দিই? নিজেরা তাদের সামনে আদর্শ স্থাপন করতে পারি? বলতে পারি, যে যাই বলুক তুমি আমার সন্তান, তোমার ভালো একমাত্র আমিই বুঝবো, কে কি বলছে তা নিয়ে তোমার কিছু ভাবতে হবেনা। সময় পাল্টেছে। প্রজন্ম বদলাচ্ছে। ৩ বছর পর পর মানুষ আরও উন্নত মস্তিস্ক নিয়ে জন্মগ্রহন করছে। নিজেদের সময়ের সঙ্গে আজকের সময়ের তুলনা করাটাও একটা মুর্খামির পরিচয়।
গ্রামের দিকে অশিক্ষিত পরিবারে স্কুল নেই। কাজ নেই। এর তার পেছনে দৌড়ে দৌড়ে পার্টির খাতায় নাম লেখাতে পারলেই কেল্লা ফতে। নইলে ওই সেই এক গল্প। যারা স্কুলে যাচ্ছে, তাদের ডাক্তার, নয় ইঞ্জিনিয়ার, নয় অফিসার হতে হবে। হতেই হবে। জায়গা, জমি বেচে ছেলে/ মেয়ের পড়ার খরচ যোগানো। বোর্ডের পড়া আর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পড়া যে এক নয়, তা তো তারা বোঝেনা। কৃতকার্য হতে না পারলেই, সেই সন্তান মা- বাবার দুঃখ বোঝেনা। আরে আমরা কি তাদের দুঃখ বুঝছি? তার হিসেবে কে রাখবে? যারা সেটা মেনে নিল, তারা আত্মহত্যা করল, যারা মেনে নিল না, তারা বিদ্রোহ করল। আর যারা পারল ক্লিক করতে সেই পরীক্ষা, তারা গ্রামের সঙ্গে সঙ্গে বাবা- মা- পরিবার ভুলে নতুন জগতে পা বাড়িয়ে দিল। পড়ে রইল হাহুতাশ।
এবারে বড়লোক ঘরে তো আরও অন্য ব্যাপার। ছোট থেকেই অন্যের কাছে মানুষ হচ্ছে সন্তান। শিক্ষা পাচ্ছে তার কাছে থেকেই। বাবা- মা অতিথি। যেটুকু সময় দিচ্ছে বাড়িতে, হয় হুল্লোড় নয়ত পড়ার জিজ্ঞাসাবাদ- এই দিয়েই দিন কাটে। সন্তানের মনের হদিস ছোট থেকে আমরা কে রাখি? কেউ তো পেট থেকে পড়েই বেয়াদব তৈরী হয়না! ঘরের পরিবেশ বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা সামাজিক পরিবেশ তাকে বেপরোয়া, বেয়াদব তৈরী করে। আমরা বড়রাই সবার আগে তাদের ওপর থেকে তখন ছাতাটা সরিয়ে নিই। শিক্ষা দেওয়া আলাদা। শাসন করা আলাদা। আদর দেওয়া আলাদা। অতিরিক্ত জ্ঞান বদহজম করে। অতিরিক্ত শাসন বিদ্রোহী তৈরী করে। আবার প্রশ্রয় অমানুষ তৈরী করে। কাজেই সবকিছুর ব্যালেন্স করে সন্তানকে আমরা ক'জন বড় করতে পারি? প্রতি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে দুর্নীতি, চলতে- ফিরতে নতুন প্রজন্ম এগুলো দেখেনা? এর মধ্যেই তারা বড় হচ্ছে। তারা বোঝেনা কিছু? তারপর সেই দুর্নীতিবাজ মানুষগুলো নীতিবাগীশ হয়ে উঠলে, তাদের কেন গুরুত্ব দিতে যাবে? বাবা- মায়ের মধ্যে সম্পর্কের ঠিক নেই। পরকীয়া তো এখন জল- ভাত। এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে উঠেছে। তারা দেখেনা? পরের প্রজন্ম আরও অশ্লীল ভাবে মেলামেশা করে একে- অপরের সঙ্গে। তাদের অশ্লীলতা নিয়ে বাবা- মায়ের নির্দেশ তারা মানবে কেন? সেটা তাদের দোষ? আমরা কি রেখে যাচ্ছি পরের প্রজন্মের জন্য? 'আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও'।
দেশের যারা চালক- তাদের সম্বন্ধে আর নাই বা বললাম। যারা সমাজের মাথায় বসে আছে তাদের কথা আর নাই বা বললাম। শুধু পরিবারের মুষ্টিমেয় কিছু গল্প তুলে ধরলাম। মিলিয়ে নিন সকলে নিজেদের সঙ্গে। যারা একটু আলাদা, হলফ করে বলতে পারি তারা সমাজের জন্য সঠিক প্রজন্ম রেখে যাচ্ছেন। আর এই বিদ্রোহীরা আমার বিশ্বাস কিছু তো করবেই। এদের আমরা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের বলে স্বীকার করি, তত পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য ভালো। নইলে কী হবে কেউ জানেনা। এই বেয়াদপেরা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে। নিজেদের চেনাচ্ছে। আওয়াজ তুলছে নিজেদের দাবি- দাওয়া নিয়ে। আঙুল তুলছে রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে। নিজেদের অশ্লীলতা ঢেকে রাখার দায় নেয়নি এরা। এরা এদের মতোই বিদ্রোহ করছে। এদের ধৈর্য নিয়ে শেখাতে হবে। কাছে টেনে আশ্বাস দিতে হবে। আত্মীয়ের মতো বোঝাতে হবে। এদের অবহেলা করলে বিপদ বাড়বে বৈ কমবেনা- এ আমি হলফ করে বলতে পারি।