top of page

বর্তমান সময়টা যেন 'ঘটিগরম' হয়ে রয়েছে

স্বর্ণালী গোস্বামী

যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ

চার বছর পূর্ণ হল লকডাউনের। গত বছরও এই নিয়ে তেমন কিছু দেখিনি। এবারে দেখছি সোশ্যাল মিডিয়া মায় কিছু সংগঠনও লকডাউনের বর্ষপূর্তি নিয়ে কাজকর্ম করছে। খারাপ নয় যদিও, এই সময় প্রচুর মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। গোটা পৃথিবী জুড়ে হাহাকার দেখেছি আমরা আর দিন গুনেছি একটি একটি করে, যারা পার পেয়ে গিয়েছি। তাই সেই সমস্ত মানুষের স্মরণেই হোক বা বিভীষিকা স্মরণ করে হোক, পালন করাই যেতে পারে এই ২৪ মার্চ দিনটিকে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নতুন করে সকলের মনে দাগ কাটানোর জন্য।

আগামীকাল আবার দোল। তাই নিয়েও বেশ উৎসব উৎসব মেজাজ চারদিকে। আমি বা আমরা বাড়ির লোকজন চিরকালই দোল ব্যাপারটার মাধ্যমে মনে রঙ লাগাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। আগে কোনও অনুষ্ঠান থাকলে একটু কপালে বা গালে রঙের টিকা লাগত, বর্তমানে অনুষ্ঠানের বালাই যেহেতু নেই, তাই রঙ তেমন লাগেনা। তবে বেশ লাগে এই উৎসবটা। সকলে বেশ রঙিন হয়ে ওঠে দোলের কিছুদিন আগে থেকেই, আকাশে বাতাসেও রঙের খেলা চলে যেন। বিশেষ করে আমার বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের রঙিন মুখগুলো দেখতেই বেশি ভালো লাগে। নিষ্পাপ মুখে রঙ যেন আরও রঙিন হয়ে ধরা দেয়। নইলে আমাদের সময়ও ছিল, এখনও আছে, এই রঙ খেলার মাধ্যমেই মানুষ বড্ড অসভ্যতামো করার ছুতো পেয়ে যায়, কেউ কিছু বলবেনা বলে। সে যাকগে, সেই প্রসঙ্গ আজ টেনে না আনাই ভালো।

এর মধ্যে আবার রাজনীতির সরগরমও কিছু কম নেই চারদিকে। ঘাড়ের ওপর লোকসভা নির্বাচন। শুধু বাংলায় নয়, সারা দেশ হৈ হৈ করছে এই নিয়ে। এবারে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করতে শুরুর দিকে যেভাবে 'ইন্ডিয়া' জোট এককাট্টা হয়েছিল, দিন যত গড়িয়েছে, ততই তা ফিকে হয়ে গিয়েছে। তবে আমাদের রাজ্যে কিন্তু বর্তমান সরকারে আসীন দল আর বিরোধী দলে বেশ টক্কর চলছে। বর্তমানের রাজনীতির অঙ্গ হিসেবে বেশ কিছু বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা বিজেপি জয়েন করল। তাছাড়া জাস্টিস অভিজিৎ গাঙ্গুলির বিজেপিতে যোগদান নিয়েও জল্পনা ভালোই হল সাধারণ মানুষের মধ্যে। যদিও সেটা বেশ কিছুদিন আগের কথা। তারপর এল কেন্দ্রের সরকার কর্তৃক সিএএ চালু করে দেওয়া। ভোটের মুখে এটাও একটা চাল কেন্দ্রের অবশ্যই। তাই নিয়ে বিজেপি যেমন ফায়দা লোটার চেষ্টা চালাচ্ছে, বিরোধী দলগুলিও তার প্রতিবাদ করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারি। আবগারি দুর্নীতি মামলায় কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। স্বাভাবিকভাবেই এই গ্রেফতারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আমি আদমি পার্টি তুমুল প্রতিবাদ জানাচ্ছে ।

এইবারে আসি একটু অন্য কথায়। আসলে রাজনীতি বিষয়টা আমি জ্ঞান হওয়া থেকেই এড়িয়ে চলতে ভালোবাসি। বাবার বেশ উৎসাহ ছিল বরাবর রাজনীতিতে। বলা ভালো, আমাদের বাড়িতেই ছিল রাজনীতি বিষয়ে উৎসাহ, অন্যান্য বিষয়ের আলোচনার সঙ্গে বাবা- জেঠু- দাদাদের মধ্যে আলোচনা হত এই বিষয়ে একসঙ্গে হলেই। কিন্তু আমি ভালোবাসতাম না। ভোট দিতে গেলে যেটুকু সচেতন হওয়া প্রয়োজন, সেটুকুই ছিল আমার উৎসাহের সীমা। এটা কিন্তু এই সেদিন অব্দিও ছিল। মনে আছে, প্রথম যখন টিভির অ্যাঙ্কারিং-এর পাট চুকিয়ে ক'দিন রেডিও ঘুরে শিলিগুড়িতে সংবাদপত্রে কাজ করতে শুরু করলাম, আমাদের কাজ শিখিয়েছিলেন ওখানকার তরাই তারাপদ স্কুলের রিটায়ার্ড হেডস্যার রবিবাবু। উনি আমাকে পাখি পড়ানোর মত করে বলতেন, স্বর্ণালী পলিটিক্যাল করো, ইন্টারেস্ট পাবে। আমি সেই এক গোঁ। স্যার, সোশ্যাল দিন না, কত তো বিষয় আছে, (আমি মূলত পোস্ট এডিট লিখতাম, ইংরিজি থেকে বাংলা অনুবাদ করে, যেটা স্যারই বেছে দিতেন 'দ্য হিন্দু' নিউজপেপার থেকে)। পরে অনেক কাজ করেছি, বিভিন্ন রকম ডিপার্টমেন্টের কাজ শিখেছি, কিন্তু পলিটিক্যাল নিউজ নৈব নৈব চ। কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম, পলিটিক্যাল নিউজ অ্যানালিসিস করার একটা আলাদা গ্ল্যামার আছে মিডিয়ায়। এই দিকে তাই আমি অবশ্যম্ভাবীভাবে আকৃষ্ট হতে লাগলাম এবং নতুন করে পড়াশুনা করতে শুরু করলাম। খুব যে অমৃতের আস্বাদ পেলাম তা নয় বলাই বাহুল্য, তবে আমি পাঁক ঘাঁটার পরিবর্তে ইতিহাসের নিরিখে রাজনীতিটাকে তুল্যমূল্য বিচার করতে শুরু করলাম প্রথম থেকে। ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন মনে হতে লাগল, এই দল ভালো করছে, আবার পরমুহূর্তেই অন্য কাজে অপর রাজনৈতিক দলের কাজ ভালো লাগলো। আমি কিন্তু কোনওভাবেই কোনও একটি দলকে নির্বিচারে ভালো বলতে পারবোনা কোনওদিনই এই কারনে। বিষয়টাই, বিশেষ করে আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যা দেখে আসছি, তার ভিত্তিতে আমার ভালো লাগেনা। শুধুই স্বার্থসর্বস্ব রাজনৈতিক দল প্রত্যেকটা তা আমি বিশ্বাস করি।

বুদ্ধদেববাবু মুখ্যমন্ত্রী হলেন, সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ, সম্ভ্রম করতাম প্রথম থেকেই। একবার মনে আছে, বোলপুর এসেছিলাম মা- বাবার সঙ্গে নিজস্ব একটা কাজে, সেই সময়ে আমরা রেলের ফার্স্টক্লাস ওয়েটিং রুমে বসে আছি, ফেরার ট্রেন ধরব বলে। দেখি হঠাৎ করে বুদ্ধবাবু ঢুকলেন। মা তো তড়ি- ঘড়ি বেরিয়ে যাবার তোড়জোড় শুরু করে দিল, আমি বললাম কেন যাবো? আমাদের ভোট পেয়েই তো উনি মন্ত্রী হয়েছেন। তখন উনি তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রকের মন্ত্রী ছিলেন। উনি নিজেও কিন্তু সেখানে বসে থাকা কাউকে উঠতে বললেন না (ওনার সঙ্গী সপার্ষদদের তা করতেও বললেন না। যদিও আমার মায়ের মতন অনেকেই তাঁকে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নিজেরাই বেরিয়ে গিয়েছিল)। কিন্তু পরে সিঙ্গুর- নন্দীগ্রাম সব চটকে দিয়েছিল। শুরুতে কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল দল গঠন করলেন,তখন সদ্য ভোটার লিস্টে নাম উঠেছে। প্রচন্ড উত্তেজিত, ওমা! কিছুদিন পরই দেখি তিনি সর্বসমক্ষে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করতে চলেছেন! বলুন দেখি, গোটা সম্ভ্রম জলাঞ্জলি। তো এইরকম হয়েছে আমার বিভিন্ন সময়ে। দেখুন না, অরবিন্দ কেজরিওয়াল যখন রাজনীতিতে এলেন, আমাদের তখন তৃণমূলের ক্ষেত্রে আশা চটকাতে শুরু করেছে। আম আদমি পার্টির প্রত্যেকে অতি শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব, চাকরি ছেড়ে রাজনীতি করতে এসেছেন দেশসেবা করবেন বলে। সবাই আমরা যারা শিক্ষা আঁকড়ে বাঁচতে ভালোবাসি, দম নিলাম যেন, রাজনীতিতে এই রকমই তো লোক প্রয়োজন, কাজ কর্ম তো যথেষ্ট ভালো শুরু করেছিলেন দিল্লিতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই যে কথায় বলে না, যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ, দেখুন তাই ঘটল! সময়টা সব মিলিয়ে ঘটিগরমের মত মুচমুচে হয়ে রয়েছে যেন।

যদিও কেজরিওয়ালের দোষ প্রমাণিত হয়নি। ভোটের মুখে এটা অবশ্যই বিজেপির একটা চাল। এইভাবে ইডি- সিবিআই দিয়ে জেলে পোরা বিজেপির একটা অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু অবশ্যই নজরে থাকবে কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।

bottom of page