top of page

নতুন সরকারের কী পুজোই দেখল রাজ্যবাসী!

স্বর্ণালী গোস্বামী

18 Oct 2026

দুর্ঘটনা, দুর্ঘটনাই হয়। তা বলে কয়ে আসেনা। কিন্তু তার আড়ালে যে বিরাট গাফিলতি থাকে বিভিন্ন স্তরে, তার বিশ্লেষণ করা, বিশেষ করে আত্মবিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন

চোরবাগান বিপর্যয়ের পর কলকাতা পুলিশে ফিরতে চলছেন বেশ কয়েকজন পুলিশকর্তা। সূত্রের খবর, পুজোর ভিড় সামাল দেওয়ার জন্যই সাময়িক ভাবে কলকাতা পুলিশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে তাঁদের। এই আইপিএস-দের প্রত্যেকেরই শহরে পুজো সামলানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি বড় পুজোগুলোর কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কী কী করণীয়, সে বিষয়েও প্রতিটি থানাকে ১১ দফা নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে লালবাজার থেকে। পাশাপাশি আজ সরিয়ে দেওয়া হল গিরিশ পার্ক থানার ওসি-কে। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হীরক দলপতিকে। হীরক কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিক। রবিবার থেকেই তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে বলা হয়েছে।

দুর্গাপুজোর আনন্দ যেন নিমেষে বদলে গিয়েছে বিষাদে। শনিবার, সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের পদপিষ্টের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৯ জনের। গুরুতর জখম ২৫ জন। দিলীপ ঘোষ বলছেন, পুলিশের সব দিক ভালো করে খতিয়ে দেখে তবে পুজোর অনুমতি দেওয়া উচিত। সামান্য ভুলের জন্য বড় ঘটনা ঘটে যেতে পারে। পুলিশ সূত্রে খবর, সন্ধ্যা প্রায় ৭টা নাগাদ হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়ে যায়। সেই চাপেই চোরবাগান পুজো মণ্ডপের বেরোনোর গেটে পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

রবিবার সকালে বৌবাজার থানা এলাকার বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে জারি হলো ১৬৩ ধারা (আগে যা ছিল ১৪৪ ধারা)। মূলত চোরবাগান সর্বজনীনকে ঘিরে যে সমস্ত এলাকা, সেখানেই এই ধারা বলবৎ করা হয়েছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা রবিবার এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা জারি করেছেন। আগামী তিন দিন অর্থাৎ সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী এই বিধি বলবৎ থাকবে। এই ধারা অনুযায়ী কোনও বেআইনি জমায়েত চলবে না। অর্থাৎ একসঙ্গে ৫ জনের বেশি মানুষ যেতে পারবেন না। লাঠি বা এমন কিছু সঙ্গে রাখা যাবে না, যাতে আইনি পরিস্থিতি নষ্ট হয়, শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৫ ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুন, ১১০ ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুনের চেষ্টা এবং ৩(৫) ধারায় একই অভিপ্রায়ে দলবদ্ধ ভাবে অপরাধের অভিযোগে মামলা রুজু করে ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে পুজো কমিটির সম্পাদক, সহ-সভাপতি, বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার দুই আধিকারিক-সহ আরও বেশ কয়েকজন রয়েছেন।




গতকালের আকস্মিক এই ঘটনায় আমি এতটাই শক পেয়েছিলাম, যে বেশ খানিকক্ষণ নিজেকে অন্য ব্যাপারে, অন্য ইউটিউব ভিডিও দেখায় ব্যস্ত রেখেছিলাম। সময় লেগেছিল খবরটা হজম করতে। ঘটনার বিবরণ শুনতে, ছবি/ ভিডিওর মর্মান্তিক ফুটেজ দেখতে। পুজোর আনন্দ করতে গিয়ে এতগুলো প্রাণ গেল! তবে আমি ওই সময়টা নিয়েছিলাম, অনেকগুলো দিক ভাবার জন্য। খতিয়ে দেখার জন্য। এই ঘটনাটা আমার নিউজ ফিডে আসার জাস্ট আগেই আমি দেখছিলাম এবং পড়ছিলাম বুলডোজার দিয়ে সিপিএম এর স্টল ভাঙার খবর। ভাবছিলাম, আমাদের রাজ্যে এও সম্ভব? বইয়ের স্টল ভাঙা হচ্ছে বুলডোজার চালিয়ে? একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ, একজন বইপ্রেমী মানুষ বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন, কাজটা ঠিক হচ্ছিল? এই পুজোর মধ্যে দেশে, দিল্লিতে কি হচ্ছে, তা আমরা জানি। নতুন প্রজন্মের অনেকটা অংশ পুজোতে মেতে উঠতে পারছেনা। তারা এমনটা ভাবতে পারেনা। তবে এটাও ঠিক, আন্দোলন সঠিকভাবে করতে গেলে, সেই জায়গায় টিকে থাকতে গেলে নতুন প্রজন্মকে আরো বুদ্ধিদীপ্তভাবে, সংবিধান মেনে, নাগরিক অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে পড়াশোনা করে তবেই পা বাড়ানো উচিত হবে। সে কথা থাক। কিন্তু বইয়ের স্টলে বুলডোজার? শুধুমাত্র কমিউনিস্টদের স্টল বলে? কেন? তারা তো আমাদের দেশের অনুমোদিত একটি দল। তারা তো পুলিশের অনুমতি নিয়েই স্টল লাগিয়েছিলেন নাকি? তাহলে? এমনটা ভাবতে ভাবতেই এই দুর্ঘটনার খবর! বিশ্বাস করুন, আমার কেমন ধক করে উঠল। হিটলারীগিরির ফল! মা নিজেই নতুন রাজ্য সরকারের শাসনকাল কালিমালিপ্ত করে দিলেন? আমি মনে মনে চুপ করে গেলাম। ধাতস্থ হলাম। তারপর আরও বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা শুরু করলাম।

আসলে প্রায় ১৬ বছর কলকাতার বাসিন্দা হলেও চোরবাগানের পুজো কোনোবারই দেখিনি। তাই সেখানকার অবস্থান বা মন্ডপ সম্পর্কে আমার কোনও ধারনাই নেই। তবে সমানে নিউজ ফিডে ভিডিও আসছিল। সজল ঘোষের ইন্টারভিউ দেখলাম। উনি বললেন, এই রকম অবস্থায় প্রথমেই এন্ট্রি গেট বন্ধ করে দিতে হয়। ক্রাউড হলে তা ম্যানেজ করার ট্রেনিং নেওয়া তো কর্তব্য, পুজো কমিটিগুলোর। আজকাল সবাই বেশি ফুটফল চায়, ক্রেজ বাড়ানোর জন্য। চোরবাগানও পুজোর আগে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার দের ডেকে তাদের দিয়ে ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করেছে। তাহলে ভীড় সামলানোর উপায় শিখবেনা? উপরি পাওনা ছিল তুমুল বৃষ্টি। যা দর্শনার্থীদের ছত্রভঙ্গ করেছিল। দাঁড়িয়ে পড়েছিল মন্ডপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভীড়। তার ওপর মাইকিং করা হয়েছিল- মন্ডপ ভেঙে পড়বে, আপনারা মন্ডপ খালি করে দিন। এবারেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পরে দর্শনার্থীরা। হুড়মুড় করে মন্ডপ থেকে বেরোনর চেষ্টা করে। ছিলনা ভেতরে লাইটের ব্যবস্থা- থিমের চক্করে! সব মিলিয়ে একে অন্যের গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং সেই অবস্থা থেকে পরিত্রান করার মত মজুত ছিলনা পুলিশ বা ভলান্টিয়ার! ফলে যা হওয়ার তাই হয়।

আসলে ইদানিংকালে সব বিষয়েই লক্ষ্য করা যায় আমরা যথেষ্ট অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছি। সবাই, সক্কলে। সমাজের প্রতিটা স্তরের মানূষ। যে কোনও বয়সের মানুষ। কেমন যেন সব সময় একটা তাড়া কাজ করে! কিসের তাড়া তা বোধহয় আমরা নিজেই জানিনা। সবসময় ছুটতে হবে। তা যেমন অফিসে, তেমন বাড়িতে এবং তেমনিই রাস্তায় বেরোলে। কিছু ভিডিওতে দেখলাম, সেখানে দর্শনার্থীরা তুমুল গায়ের জোরে ব্যারিকেড ভেঙে নিজেদের মত করে ঢুকতে চাইছে, শীর্ণকায় ভলান্টিয়াররা কিছুই করতে পারছেনা। সেটা কার দোষ? গতকাল রাতে সজল ঘোষ লাইভ করে মানুষদের হাতজোড় করে আবেদন জানাচ্ছিলেন বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, মানুষ এগিয়েই চলেছে প্যান্ডেলের দিকে! নিজেরাই নিজেদের মরণ ফাঁদ পাতছেন না, আপনারা? পুলিশ এবং দমকল- এই দুটি বিভাগের দায়িত্ব বর্তায় প্রত্যেকটা পুজোয় যথেষ্ট সেফটি সিকিউরিটি নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখে তবেই অনুমতি দেওয়ার। আপনারা তা করেছেন? গত দিনগুলিতে বেশ কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার ভিডিও করে বলেছে, চোরবাগানে মাত্রাছাড়া ভীড় হচ্ছে, যে কোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কেউ সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি কেন? পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ কী করছিল? পুজো প্যান্ডেলে পর্যাপ্ত পুলিশ/ ভলান্টিয়ার/ হোমগার্ড ছিল না। তার দায় ক্লাবের কর্মকর্তাদের। যে বেসরকারি এজেন্সিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা তা ঠিকমতো পালন করছে কি না, কে দেখবে? তারা সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন? নতুন সরকার আসার পর পুরোনো পুজো কমিটি মেম্বারদের ভাগিয়ে দিয়ে নিজেরা পুজোর দখল নিয়েছিলেন। নতুন করে ভূমিপুজো করা হয়েছিল। কেন? বলুন এগুলোর জবাব কে দেবে? এইমাত্র একটা লেখা পড়ছি, ক্লাবের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ঠাকুরের মুখ ঘুরিয়ে দিলে ওই পুজোয় কিছু না কিছু অঘটন ঘটে। তাছাড়াও যখনই খুঁটিপুজোর নির্দিষ্ট জায়গার বদল হয়েছে, ততবারই বিপর্যয় হয়েছে। নতুন সম্পাদক বা অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন? না। তাহলে পুজোর দখল নেওয়ার জন্য এত জিভ লকলকালো কেন? এই মৃত্যুগুলোর দায় আপনারা নেবেন? খুব তো সনাতনী বলে হাঁক পাড়েন, এই সমস্ত অলৌকিক ব্যাপারে বিশ্বাস আছে আপনাদের? পুজো নিয়ে খেলায় মেতেছিলেন? নিজেরা নিজেদের বিবেকের সঙ্গে কথা বলুন। জানেন, বিবেক বস্তুটা কী? দখল নিতে যান পুজোর, ভীড় তৈরী করে ক্রেজ বাড়াতে চান, অথচ মানুষের প্রাণের আশ্বাস দিতে পারেন না? যে শিল্পী থিম বানিয়েছিলেন, তাকেও বলব, আপনি থিমের চক্করে গোটা মন্ডপ অন্ধকার করে রাখলেন। বেশ, ভালো কথা। কিন্তু একবারও মনে হলনা, যদি ভীড় অতিরিক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে আলোর প্রয়োজন হতে পারে! কেমন শিল্পী আপনি? আপনাদের তো মানবিকতাই একমাত্র মূলধন! এক্সট্রা লাইটের ব্যবস্থা তো রাখা যেত! পরিস্থিতি বেগতিক হলে যাতে তার প্রয়োগ করা যায়! ফুটলাইট রাখা যেত! কেন নিলেন না সেই ব্যবস্থা? কে দেবে উত্তর?

দর্শনার্থীরা নিজেরা, ক্লাবের কর্তারা, পুলিশ এবং সর্বোপরি প্রশাসন- সকলের দায় আছে এই ঘটনায়। মুখ্যমন্ত্রী নাকি গিয়েছিলেন উদ্বোধন করতে! তিনি খেয়াল করলেন না কেন, ঢোকা এবং বেরোনোর রাস্তা সরু, আলো কম! এই একটা ঘটনা কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে কলঙ্ক রেখে গেল। আশা করব এর পরে সরকারের (যে কোনও সরকার থাকুক না কেন রাজ্যে) টনক নড়বে। দুর্গাপুজোর মত এত বড় ইভেন্টকে (আনন্দোৎসব বললাম না, কারন আমি জানি ধীরে ধীরে সেই তকমা মুছে যাবে আমাদের রাজ্য থেকে। হয়ে যাবে একটা বিগ ইভেন্ট) ছেলেখেলা হিসেবে না নিয়ে, 'এমন পুজো করে দেখাবো, মানুষ মন রাখবে' বলে হামবড়া না দেখিয়ে সত্যিকারের গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টা দেখবে। সত্যিই এই সরকার এমন পুজো দেখাল, রাজ্যের মানুষ মনে রাখবে।

দুর্ঘটনা, দুর্ঘটনাই হয়। তা বলে কয়ে আসেনা। কিন্তু তার আড়ালে যে বিরাট গাফিলতি থাকে বিভিন্ন স্তরে, তার বিশ্লেষণ করা, বিশেষ করে আত্মবিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page