top of page

নতুন সরকার। অনেক আশা

স্বর্ণালী গোস্বামী

10 May 2026

দেখার, বিভিন্ন দুর্নীতির মোকাবিলা, রাজ্যের সুরক্ষা, শিক্ষা তথা স্বাস্থ্যের পুনর্বিন্যাস, আর্থিক বিরাট ঋণের বোঝা সামলানোর পাশাপাশি সামাজিক বিষয়টিকেও কিভাবে সামলায় নতুন সরকার

রাজ্য আজ গেরুয়াময়। গত সপ্তাহে যেখানে শেষ করেছিলাম, আজ সেখান থেকেই শুরু করছি। তৃণমূল কংগ্রেস ফের ক্ষমতায় আসীন হলে রাজ্যের অবস্থা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তার হিসেবে রাখা যেত না, বলে আমি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম। আমার মত অনেকেই তা ভাবছিলেন, সেটা ভোটপ্রদানের হার দেখেই মালুম হচ্ছিল, তাও আমি বলেছিলাম আমার আগের লেখায়। এবারের ভোটের ফলাফল কি হতে চলেছে, তা বোঝার জন্য ভোটকুশলী হওয়ার প্রয়োজন ছিলনা। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা, বিজেপি নেতাদের আত্মবিশ্বাস বুঝিয়ে দিচ্ছিল কি হতে চলেছে। ঠিক তাই হল।

গতকাল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ব্রিগেড গ্রাউন্ডে এলাহী ব্যবস্থাপনার মধ্যে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী সহ বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। ছিলেন বিজেপির একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব, রাজ্যের বিভিন্ন জগতের মানুষ সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সাধারণ মানুষও। প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন এই অভাবনীয় জয়ের কৃতজ্ঞতা হিসেবে। তবে আমার আক্ষেপ রয়ে গেল প্রধানমন্ত্রী সকলের উদ্দেশ্যে কিছু একটু বললেন না এবং মঞ্চে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবস্থা করা হলনা। হয়ত আমার মত অনেকের মনেই এই আক্ষেপ ছিল কিন্তু আবেগের আতিশয্যে কেউ জনসমক্ষে তা প্রকাশ করেননি। তবে যাই হোক। নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছর কেমন রাজ্য চালায় তা নিয়ে সকলেরই কৌতূহল থাকবে। যেটা খুব স্বাভাবিক। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।

তবে এই লেখায় একটি বিষয়ের উল্লেখ না করলে লেখাটি অসম্পূর্ন রয়ে যাবে। তা হল শুভেন্দু অধিকারীর নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর জয়। বিশেষ করে ভবানীপুর কেন্দ্রে যেভাবে তিনি বলে বলে কত নম্বর কাউন্টিং এ কেমন মার্জিন থাকবে, তা বলে দিয়েছিলেন, তা অভাবনীয়! বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী কখন এগিয়ে থাকবেন, তিনি কখন এগিয়ে যাবেন, তার নিখুঁত বিশ্লেষণ করেছিলেন কাউন্টিংএর দিন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে। তেমন তেমন ই ঘটল। এটা করতে যে প্রচুর খাটনি খাটতে হয়েছে, নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি তৈরী করতে হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। নিজের স্বভাবজাত ভঙ্গিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউন্টিং হল এ গিয়ে কাউন্টিং বন্ধও করিয়ে দেন এক সময়ে। নাকি কপিল সিব্বলকে ফোনও করেছিলেন। কিন্তু পরে দিল্লির ইলেকশনার কমিশনারের চাপে পড়ে কাউন্টিং শুরু হয় এবং যথারীতি ১৫,০০০ এর কিছু বেশি ভোটে শুভেন্দু জেতেন। আরও একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই জিতের দামও চোকাতে হল শুভেন্দু অধিকারীকে। তাঁর আপ্তসহায়ক খুন হয়ে গেলেন হিন্দি ফিল্মের স্টাইলে একেবারে গাড়ির কাঁচের বাইরে থেকে নিখুঁত শুট আউটের মাধ্যমে। দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী, প্রাক্তন বায়ুসেনাকর্মী চন্দ্রনাথ রথের এই নৃশংস খুনে হতচকিত এবং স্তব্ধ হয়ে যান সেই রাতে বিজেপির সকলে। প্রত্যেকের কাছের মানুষ ছিলেন চন্দ্রনাথ, তা সকলে একবাক্যে স্বীকার করছেন সবাই। শুভেন্দু ভেঙে পড়েছিলেন এই ঘটনায়, বলেন তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি হল।

ভোটের এই ফলাফল রাজ্যে দু'রকম প্রভাব ফেলছে। আমার মনে হয়, গোটা রাজ্যে নয়, আমাদের এই শহরেই এই দ্বিমুখী ভাব বেশিভাবে প্রকট হয়েছে। যাঁরা রাজ্যের উন্নতি চাইছিলেন তাঁরা যথেষ্ট আহ্লাদিত, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বেশ কিছু শিক্ষিত মানুষ, ভাবছেন এবারে রাজ্যটা হিন্দিভাষীদের কবলে চলে যাবে। এই আশঙ্কা কিন্তু হচ্ছে, বিশেষ করে শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে। তবে আমি বলব স্যুটেড বুটেড মানুষদের থেকেও এই আতঙ্কে ভুগছেন বিশেষ করে সাংস্কৃতিক জগতে নিজেদের মত করে সংস্কৃতির চর্চা যাঁরা করতেন, একটু উন্নাসিকতার আঁচে নিজেদের ভিজিয়ে দুলকি চালে যাদের সাংস্কৃতিক চর্চা চলত তাদের মধ্যে। কানে কানে বললে বলতে হয়, চুপি চুপি এর ওর মাধ্যমে তৃণমূলী দাদাদের বা দিদিদের ধরে করে যারা নিজেরা একটু আধটু মঞ্চ আলো করতেন, হিন্দিভাষী দেখলেই যাঁরা তেড়ে আসতেন, 'আমাদের জায়গায় বাংলাই বলতে হবে' এমন বলে যাঁরা ঝগড়া জুড়ে দিতেন, মমতার বেতালা, বেসুরো গান শুনে বেশ মজা পেয়ে পেয়ে মুচকি হাসি হাসতেন, তাদেরই জ্বালা ধরছে বেশি। তাছাড়া কিছু বামপন্থী মানুষ আছেন, বলা ভালো অতিবাম যাঁরা, তাঁরাও এভাবেই হিন্দি বলয়ে রাজ্য চলে যাবে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে রাজ্যের পটপরিবর্তনের এই খুশির আবহকে দমিয়ে রাখতে চাইছেন। গতকালই তার প্রকাশ আমরা দেখতে পেয়েছি। রবীন্দ্রসদনে এবারে কোনও অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই নিয়ে গেল গেল রব তুলেছেন অনেকেই। তবে জোড়াসাঁকোতে কিন্তু যেমন অনুষ্ঠান হয়, তেমনটাই হয়েছে। সেখানে শিক্ষিত মানুষ কেন এভাবে ভাববেন না, নতুন সরকার নিজেদের মত করে কিছু সিদ্ধান্ত নেবে, তা আমাদের মানিয়ে নিতে হবে! যেখানে অনুষ্ঠানটা হচ্ছে, সেখানে গেলেই তো হয়! এছাড়াও টুকরো টুকরো ভাবে বিভিন্ন জায়গায় রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হয়েছে, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখাও গেছে। আবার এই অতি সমালোচকদের দল কালকে দ্রোহের রবীন্দ্রজয়ন্তীও পালন করেছে। সে হোক। আমার যেটা বলার, এগুলো নিয়ে, আস্তে আস্তে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে, তার যথাযথ ব্যবস্থা করে নতুন সরকারকে এগিয়ে চলতে হবে।

শহরের এই ব্যাপারটাই সবচেয়ে বেশি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বাঙালিদের বাঙালিয়ানা থাকবেনা। বাঙালিরা নিজেদের জায়গাতেই একঘরে হয়ে যাবে। হিন্দিভাষীরা তাদের একপেশে করে রাখবে। সেটা কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সজাগ থাকতে হবে, যেন কার্যত সেটা না হয়। বিরোধিতা করতে চাইলে কেউ করতেই পারে, কিন্তু বাস্তবে সেটা যেন না হয়, তা দেখার দায়িত্ব নতুন সরকারের বাঙালি নেতৃত্বকে নিতে হবে। যদিও নতুন মুখ্যমন্ত্রী বারে বারে সেই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। বলছেন বাঙালি মনীষীদের ভাবনাকে সামনে রেখে এগোবে নতুন সরকার। এখন দেখার, বিভিন্ন দুর্নীতির মোকাবিলা, রাজ্যের সুরক্ষা, শিক্ষা তথা স্বাস্থ্যের পুনর্বিন্যাস, আর্থিক বিরাট ঋণের বোঝা সামলানোর পাশাপাশি এই সামাজিক বিষয়টিকেও কিভাবে সামলায় নতুন সরকার!

তবে আমার বিশ্বাস, প্রথম পাঁচ বছর চুটিয়ে কাজ করবে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। কথাবার্তায় বোঝাই যাচ্ছে, কাজের জন্য মুখিয়ে আছে সকলে। গতকাল থেকেই মুখমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আলোচনাপর্ব শুরু করে দিয়েছেন। ধর্মতলায় পূর্ত দফতরের তাঁবুতে প্রথম প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা, স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষ এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত। রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি খোঁজখবর নেন ওই বৈঠকে। সোমবারও নবান্নে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে তাঁর বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে। সোমবার নবান্নে পর পর তিনটি বৈঠক সারবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে প্রথমে একটি পর্যালোচনা বৈঠক করবেন তিনি। এর পরে দুপুরে জেলাশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পরে বিকেলে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গেও একটি বৈঠক রয়েছে শুভেন্দুর। সূত্রের খবর, বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জোনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহনের কয়েকঘন্টার মধ্যেই শুভেন্দু অধিকারীর উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হল অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার তথা এই নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ সুব্রত গুপ্তকে। পাশাপাশি তাঁর নতুন পার্সোনাল সেক্রেটারি হলেন আইএএস শান্তনু বালা। আশা করা যায় এতদিনের হতাশা কাটিয়ে বাংলার মানুষ নতুন রাজ্য পাবে এবং সুশাসন পাবে। যেখানে নতুন সরকারের পরিষেবা দেওয়াই মুখ্য উদ্দেশ্য হবে, নিজেদের আখের গোছানো নয়।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page