
স্বর্ণালী গোস্বামী
3 May 2026
এবারের ভোট যে একটা ইতিহাস তৈরী করে রেখে গেল, তা বলাই বাহুল্য
রাত পোহালেই ভোটগণনা। এরই ফাঁকে একটু আড্ডা মেরে নেওয়া যাক। এবারের ভোট যে একটা ইতিহাস তৈরী করে রেখে গেল, তা বলাই বাহুল্য। প্রথম দফাতেই চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল সবার! এমনও সম্ভব? ভোট ছাপ্পা নেই,বুথ দখল নেই, খুনোখুনি নেই, ইভিএম লুঠ নেই- এ রাজ্যে এমন ভোট- ও সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব করে দেখাল নির্বাচন কমিশন। সর্বমোট ৯৩% ভোট পড়েছে রাজ্য! যা গোটা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও চোনা পড়ে গেল দ্বিতীয় দফায়। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও ওই সেই ডায়মন্ড হারবার- যা নিয়ে সকলের বক্তব্য ছিল, সেই কেন্দ্রেই ইভিএম আতর, টেপ দিয়ে সিল করা- হুমকি, মারামারি- সব হল। কিন্তু নির্বাচনের জন্য নিযুক্ত 'সিংঘম' নামে ভূষিত ডায়মন্ড হারবারের স্পেশাল পুলিশ অবজার্ভার উত্তরপ্রদেশের আইপিএস অজয় পাল শর্মা তেমন কিছু খেল দেখাতে পারলেন না। তাঁরই এলাকায় সবচেয়ে বেশি অশান্তি হল। ফলতায় আগামী ২১ মে পুনর্নির্বাচন হতে চলেছে। ২৮৫ টি বুথেই হবে নতুন করে নির্বাচন। এতটাই ভয়াবহ কারচুপি হয়েছে সেখানে। ধরা পড়েছে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরায়। তবু অভিষেক বলছেন কার কত বড় ক্ষমতা দেখি, অভিষেক মডেল ভাঙতে পারে! মানেটা কি? গুন্ডাগিরি করে ভোট করানো, আবার গলাবাজি? হুমকি, মারপিট করছে দলের নিচুতলার কর্মীরা আর নেতাও হুমকি দিচ্ছে? চ্যালেঞ্জ করছে প্রশাসনকে সর্বসমক্ষে? তারই চ্যালা জাহাঙ্গীর তাহলে একাই শুধু দোষের ভাগী? এই তো অবস্থা আজকের রাজনীতির...
প্রচন্ড বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে কোনওরকমে SIR প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভোট প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। প্রচার পর্বের মধ্যেই যত দিন এগিয়ে আসছিল, কেন যেন মনে হচ্ছিল, হাওয়ার দিক বদল হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীকে বড্ড অস্থির লাগছিল প্রতিটি জনসভায়। ভোটের ইস্যু মাছ- মাংস খাওয়ার মধ্যে এসে গিয়েছিল। বাংলা ভাষার মধ্যে এসে গিয়েছিল। তার সঙ্গে তো ছিলই বিরোধী দলকে 'বহিরাগত' তকমা দেওয়ার চিরন্তন বাণী। আমাদের দেশ তো ভারত, সেখানকার প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বহিরাগত হবেন কেন? সর্বভারতীয় একটা দলের সদস্যরা বহিরাগত হবেন কেন? সে প্রশ্ন কেউ করেন! যাক যে। মূলত খেলাটা ঘুরতে শুরু করল, যখন বিজেপি তাদের সংকল্প পত্রে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে ৩০০০ টাকা এবং যুবদের ৩০০০ টাকা দেবার কথা ঘোষণা করল। আর ছিল দুই পক্ষের নির্মিত দলীয় গান এবং বিজ্ঞাপন। তৃণমূল এবং বিজেপি দফায় দফায় এই বিষয়ে একে অপরকে যেন জবাব দিচ্ছিল! বিজেপি ক্ষমতায় এলে নতুন কি করবে, তা সময় বলবে, গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী আর যাই হোক, সরকারের বদল দরকার। এত দুর্নীতির মধ্যে দিয়েও যদি তৃণমূল ক্ষমতায় আসে, তাহলে এই রাজ্য রসাতলে যাবে। রাজ্যের মানুষ অসুরক্ষিত হয়ে পড়বে। দুর্নীতির সীমা- পরিসীমা থাকবেনা। রাজ্যটা গোটা দুনিয়ার কাছে খরচের খাতায় চলে যাবে।
আসলে সিপিএম এর নৈরাজ্যের থেকে মুক্তি পেতে রাজ্যের মানুষ ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেয়ারে বসিয়েছিল। অনেক আশা ছিল তখন মানুষের মনে। রাজ্যের উন্নতি হবে। দুর্নীতি বন্ধ হবে। গরিব গুর্বোরা সম্মানের সঙ্গে খেয়ে পরে বাঁচবে। চাকরি- বাকরির সংখ্যা বাড়বে- ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। প্রথম পাঁচ বছর সিপিএম এর নিন্দা- মন্দ করে, শহরটাকে সৌন্দর্যায়নের মধ্যে দিয়ে মানুষের মন জিতে নিতে শুরু করেছিলেন মমতা। নীল-সাদা রঙ, ত্রিফলা আলো নিয়ে সেই সময়েই দুর্নীতির গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মানুষ ভাবল, থাক, আর একটু সময় দেওয়া যাক। যাই হোক, টাকা- পয়সা খেলেও কিছু কাজ তো করছে! সেটাই কাল হল। এইবারে সরকারি চাকরির সব পথ চিরতরে বন্ধ হতে শুরু করে দিল। যেখানেই উন্নতি, সেখানেই দুর্নীতি- এমন সমান্তরালভাবে দুর্নীতি মাথা- চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। মানুষ ধীরে ধীরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠতে লাগল। বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ হিসেবে মমতা তা ভালোই বুঝতে পারলেন। শুরু হল অন্য খেলা। এল আইপ্যাক। ব্যাটন নিলেন অভিষেক। রাজ্যের সর্বস্তরে দলের ছড়ি ঘুরতে শুরু করল। পুলিশ- প্রশাসন পুরোটাই করায়ত্ত করে নিল তৃণমূল দল। প্রত্যেককে কাজে লাগাতে শুরু করল ভোটের কাজে। কব্জা করে নিল পুরো সিস্টেম। পাশাপাশি চলতে লাগল দলে অশিক্ষিত গুন্ডাদের রমরমা। বোমাবাজি, খুন, সন্ত্রাস, হুমকি, মহিলাদের নির্যাতন, ধর্ষণ। সমান্তরালভাবে যত রকমের অনৈতিক কাজ করার পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বন্ধ করে দেওয়া। টাকা নিয়ে প্রশাসনের সর্বস্তরে অশিক্ষিত লোকজনকে ঢোকানো। তার সঙ্গে মোক্ষম দোসর হল বিভিন্ন ভাতা প্রকল্প। সমাজের নিচুতলার লোকজন কেউ কাজকর্ম ছাড়া বাড়িতে বসে গেল আর বাইরে গুন্ডাগিরি করতে লাগল, কেউবা রাজ্য ছেড়ে বাইরে চলে গেল কাজের তাগিদে। এইভাবে ভোট- লুঠ করে, সন্ত্রাস করে সমস্ত স্তরের নির্বাচনে তৃণমূল কব্জা করে বসল। যে স্বপ্ন নিয়ে রাজ্যের মানুষ এনেছিল তৃণমূলকে, তা একেবারে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল। তবে সাংস্কৃতিক জগতে কিছু পুরস্কার আর মিষ্টি মিষ্টি কাকিমা সুলভ কথাবার্তা বলে তাদের একাংশকে নিজের দিকে টানতে সক্ষম হয়ে গেলেন মমতা। যা সাংঘাতিক একটা স্থবিরতা এনে দিল রাজ্যের সাংস্কৃতিক জগতে। আরও ভয়াবহ হল বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের টাকা নিয়ে এই রাজ্যে অবাধ প্রবেশের ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া। কিছু কিছু জায়গায় তো বর্ডারে ফেন্সিং অব্দি দিতে দিতনা রাজ্যের সরকার। এই নীতির ফলে গোটা দেশ অসুরক্ষিত হয়ে পড়তে লাগল। গ্রামের দিকে মুসলিমরা দিন দিন সন্ত্রাসবাদীতে রূপান্তরিত হতে লাগল। হিন্দুরা তাদের নিজেদের জায়গায় নিজেরাই থাকতে ভয় পেতে শুরু করল। বহু মানুষ গত নির্বাচন থেকে ঘরছাড়া। বিভিন্ন পডকাস্টে সাক্ষাৎকার দেখে এগুলো জেনেছি। আমরা শহরে বসে এই ভয়াবহতার কথা তো জানিই না।
এবারে বিজেপি-র কাছে আমাদের কোনও আলাদা স্বপ্ন নেই। আমার বিশেষ করে। আমি তো ভোটও দিইনি। বিগত বেশ কিছু নির্বাচনে আমি 'নোটা'য় ভোট দিই। তবে প্রচন্ডভাবে চাইছি, রাজ্যে সরকারে আসুক বিজেপি। গণতান্ত্রিক দেশে দুর্নীতিবাজ সরকার হলে গদির পরিবর্তন হওয়া দরকার। রাজ্যের কি হবে তা পরে ভাবা হবে। একটা দল মাথায় চড়া থেকে অন্তত থামবে। আর একটা কথা- হিন্দুরা গ্রামীণ এলাকায় সুরক্ষিত হবে। যেটা খুব প্ৰয়োজন। এছাড়াও বিজেপির উচ্চস্তরিয় নেতারা যেমন শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারী, প্রমুখেরা রাজ্যে শিল্প আনার দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। যেটা এইমুহূর্তে খুব প্রয়োজন। সরকারি চাকরির দরজা খুলবে বলছেন। যা শিক্ষিত যুবসমাজের খুব দরকার। দেখা যাক, কিভাবে কি হয়। রাজ্যের যে বিপুল সংখ্যক দেনা রয়েছে বাজারে, সেটা সামলে কিভাবে বিজেপি রাজ্য চালায় সেটা অবশ্যই দেখতে হবে। আর যদি তেমন তেমন রাজ্যটাকে সামলাতে পারে, আগামী নির্বাচনে আমি ভেবেছি বিজেপিকে ভোট দেব।
মনে আমার কমিউনিজম থাকলেও এই মুহূর্তে কমিউনিস্টদের সরকারে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই। কংগ্রেসও আসতে পারবেনা। তাই বেশ কিছুকাল যাবৎ আমি 'নোটা'য় ভোট দিচ্ছি। তৃণমূলকে আমি কিন্তু এর মধ্যে কোনোবারও ভোট দিইনি। বিয়ের আগে কংগ্রেস ছেড়ে যেবার প্রথম মমতা নতুন দল গড়লেন, সেবার দিয়েছিলাম। সম্ভবত সেটা আমার প্রথম বা দ্বিতীয় ভোট ছিল। পরে বুঝতে শুরু করলাম, এ পুরোই ভাঁওতাবাজি। আর বিজেপি তো শুরু থেকেই হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাস করে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে ধর্মভিত্তিক কোনও দলকে আমি অন্তত ভোট দিতে পারিনা। শিফ্ট করে গেলাম বাম ভোটে। একবার/ দু'বার কংগ্রেসকেও ভোট দিয়েছি। যদিও ২০১১ সালে আমি কলকাতায় ছিলাম। ভোট আমাদের ছিল শিলিগুড়িতে। তাই সেবারে ভোট দেওয়াই হয়নি। থাকলে সেবার হয়ত তৃণমূলকেই দিতাম। কারন চাইছিলাম সরকারের পরিবর্তন। তখনও সম্ভবত 'নোটা' আসেনি। এখন ভাবি, ভাগ্যিস ভোট দিইনি! নইলে প্রচুর মানুষের মত আমারও নিজেকে দোষী মনে হত। কিন্তু NOTA আসার পর থেকে আর ভাবিনি। সেখানেই নিজের আঙুল টিপেছি। সে যতই আমায় কেউ বোকার দলে ফেলুক আমি পরোয়া করিনা। ওটাই ছিল আমার নিজের মত করে প্রতিবাদ গোটা দেশের সিস্টেমের বিরুদ্ধে। তবে হ্যাঁ, দেখি আগামীতে কোনও দলে ভোট দেওয়ার মত মন তৈরি হয় কি না।