
স্বর্ণালী গোস্বামী
19 Jul 2026
এখন যে কোনও রাজনৈতিক দল তাদের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে পদত্যাগ করার নীতিতে বিশ্বাস ই করেনা
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এতটাই দৃঢ় মানসিকতা। শনিবার সকালে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থল থেকে পুলিশ চাদরে মুড়ে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরেও অনশন ভাঙেননি সোনম ওয়াংচুক। হাসপাতালেই অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নুনজল ছাড়া আর কিছু খাচ্ছেন না। দিল্লির সফদরজং হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে এমনটাই জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো। দিল্লি হাই কোর্ট জানিয়েছিল, সোনমের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখতে হবে সরকারকে। এর পরেই শনিবার সকালে যন্তর মন্তরের সামনে থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে যায় হাসপাতালে।
যদিও সোনমকে তুলে নিয়ে গেলেও যন্তর মন্তরের সামনে বাকিদের অনশন অব্যাহত। ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে শনিবার থেকে সোনমের জায়গায় অনশন শুরু করেছেন। এখনও তাঁদের দাবি নিয়ে কেন্দ্রের তরফে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। দুটি মার্কিন নাগরিক সংগঠন শুক্রবার (মার্কিন সময়) ওয়াশিংটন ডিসি'তে বিষয়টি নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ‘হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটস’ এবং ‘দ্য আজাদি প্রজেক্ট’-এর কর্মীরা ভারতীয় দূতাবাসের কাছে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির সামনে জড়ো হন। এরপর তাঁরা সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ দেখান। পাশাপাশি ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, প্রশ্ন ফাঁসের জবাবদিহি করা ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিও জানান তাঁরা। বিক্ষোভের আগে ‘হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটস’ নামক সংস্থাটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একটি খোলা চিঠিও লেখে। সংস্থাটি সরকারকে অবিলম্বে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে, পরীক্ষা পদ্ধতির ত্রুটিগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে এবং সময়োপযোগী প্রক্রিয়া শুরু করতে আহ্বান জানায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্র- ছাত্রীরা আসছে অনশন মঞ্চে। কলকাতা থেকেও অভয়া নিয়ে যে জুনিয়ার ডাক্তারেরা গর্জে উঠেছিলেন, তাঁরা গেছেন দিল্লিতে সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে। এসএফআই- এর একটা বড় সমর্থন পাচ্ছে এই আন্দোলনরত ছাত্র- ছাত্রীরা।
১৬ জুলাই নিজের শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও আগামী ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে দেশবাসীকে শান্তিপূর্ণভাবে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সোনম। উল্লেখ্য, দিল্লির যন্তর মন্তরে গত ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশনে বসেছেন ওয়াংচুক। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়, বিশেষ করে NEET পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জবাবদিহি নেই। শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, পরীক্ষা পরিচালনায় সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ-সহ একাধিক দাবি তুলেছেন ওয়াংচুক। আগামী ২০ জুলাই শুরু হচ্ছে সংসদের বাদল অধিবেশন। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ওয়াংচুক ওই সংসদ অভিযানে যোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। অনশনরত সমাজকর্মী ওয়াংচুকের কথায়, এটি কোনও ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার দাবি। বস্তুত NEET-সহ একাধিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস (সিজেপি)। সেই মঞ্চেই অনশন করছিলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক।
এ তো গেল মূল খবর। এবারে ভাবা যাক, একটু অন্যভাবে। প্রথমত, অনশন মঞ্চের সামনে খাবারের স্টল নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক যথেষ্ট দানা বেঁধেছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, মঞ্চের আশপাশে এই ধরনের খাবারের স্টল না থাকাই ভালো। যাঁরা বাইরে থেকে আসবেন, তাঁরা খাবারের জায়গা নিজেদের স্বার্থে নিজেরা খুঁজে নেবেন। পাশাপাশি দেশের একটা বৃহৎ অংশ এই অনশন নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়, তা আমরা বুঝতেই পারছি। এমনকি মিডিয়াও তেমন গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপারটা প্রচার করছেনা। ইতিমধ্যেই দিল্লি পুলিশ বলেছে ২০ জুলাই কোনওরকম মিছিল করা চলবেনা। অর্থাৎ সংসদ অভিযানের অনুমতি দিচ্ছেনা দিল্লি পুলিশ। তাদের বক্তব্য, ওই দিন এমন অভিযানের জন্য কোনওরকম অনুমতি নেয়নি ককরোচ জনতা পার্টি বা অন্য কোনও দল। দলের মুখপাত্র বৈষ্ণবী গৌর বলেন, ‘‘আমরা অনেক আগেই পুলিশকে মিছিলের বিষয়ে জানিয়েছিলাম। তারা আমাদের মিছিল বা কর্মসূচি সম্পর্কে ভাল ভাবেই অবগত।’’ তবে এ-ও স্বীকার করেছেন, বিষয়টি লিখিত ভাবে জানানো হয়নি। সশরীরে দিল্লি পুলিশের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছিল।
গত পরশু দিন রাতে আমার মেয়ের সঙ্গে এই নিয়ে কথা হচ্ছিল। খুব উত্তেজিত ছিল সে। বলছিল, আমি কলকাতায় থাকলে দিল্লি চলে যেতাম, ব্যাড লাক- দেশের বাইরে আছি। আমি সেদিনই ওকে বলেছিলাম, বর্তমানে রাজনীতির ধারা বদলে গেছে। এভাবে কোনও সুরাহা হবেনা। আন্দোলনে গা ভাসানো এক আর কোনও সমস্যার সুরাহা করা এক। এখন যে কোনও রাজনৈতিক দল তাদের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে পদত্যাগ করার নীতিতে বিশ্বাস ই করেনা। ১০০ বছরের ন্যায়- নীতি বর্তমান রাজনীতিতে খুঁজতে যাওয়ার অর্থ তুমি এই রাজনীতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নও। আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, কিভাবে রাজনৈতিক নেতারা গদি আঁকড়ে দল বদলে যাচ্ছেন অবলীলায়! সেক্ষেত্রে পদত্যাগ? বাস্তবে তা হয় নাকি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে? বর্তমান রাজনীতিবিদরা নিজেদের মত করে দেশের নাগরিকদের সমস্যার সমাধান করবে। দেশের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী নয়। তাই জন্যই সরকারের তরফে একবারের জন্যও কেউ অনশনরত সোনমের কাছে বা ছাত্রদের কাছে এসে কথা বলতেও চায়নি। দাবি মানা তো দুরস্ত! এটাই দস্তুর। আমাদের দেশ বাংলাদেশ বা নেপালের মত অত ছোট দেশ নয়, যে ছাত্র আন্দোলন দেশের চেহারা বদলে দেবে। সবচেয়ে বড় কথা- দেশের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যার নিরিখে ওই অনশন মঞ্চে কতজন এসেছে? যা দেখা যাচ্ছে, গ্রাম থেকে আসা ছাত্র- ছাত্রীদের সংখ্যাই বেশি। শহুরে পড়ুয়ারা আশপাশ থেকেই শুধু এসেছে। কেন? প্রত্যেকের কী এই দায় বর্তায় না, যে তাদের ইস্যু, সমাজের সব স্তরের সব ছাত্র- ছাত্রী জড়ো হওয়া উচিত ছিলনা? সেখানেও মস্ত গলদ। বর্তমানের শহুরে মা-বাবারা এমন আন্দোলনের শরিক করতে দিতে চান না নিজেদের ছেলেমেয়েদের। কেন? ঘুরে ফিরে সেই কথা। সময় পাল্টে গেছে। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এই ধরনের আন্দোলন হওয়া উচিত। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে। ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। সমাধান হবেনা জেনে নিয়েই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। জোটবদ্ধ হতে হবে। আবার কোনও ইস্যুতে ফের একত্রিত হতে হবে। পিছিয়ে পড়লে চলবেনা। সরকার কথা বলবেনা। কিন্তু তাতে ভেঙে পড়লে চলবেনা। ফের জোটবদ্ধ হতে হবে। বারে বারে জোটবদ্ধ হতে হবে। সেটা কী আদৌ পারবে এই ছাত্র সমাজ?
একটা সময়ের পর তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তখন ছোটদের নেতৃত্ব দিতে হবে। এবারে আমি বলব, সোনম ওয়াংচুকের একটু হলেও ভুল ছিল। আমরণ অনশন কেন? আমি যদি সাধারণ একজন খবর নিয়ে নাড়াঘাঁটা করা মানুষ সরকারের এই মানসিকতা বুঝতে পারি, তিনি কেন বুঝলেন না? আমরণ অনশন কেন? প্রতিবাদ অহিংসা সভা নয় কেন? আমি মরে গেলে কিছুই তো করতে পারব না পরবর্তী প্রজন্মের জন্য! বরং বেঁচে থাকলে সঠিক দিশা দেখাতে পারব ভবিষ্যতে আবারও। এই যে ২০ তারিখ কোনও লিখিত অনুমতি নেওয়া হয়নি, সোনম কী তা জানেন? যদি জানেন, তাহলে বলব কেন সঠিক আইন মেনে সংসদ অভিযানের পরিকল্পনা করলেন না? যদি না জানেন, তাহলে বলব, কেন জানলেন না? দায়িত্ববান প্রবীণ নেতা (ছাত্রদের দিশা দেখানোর) হিসেবে তা জানা উচিত ছিল। হাসপাতাল থেকে একটি হাতে লেখা বার্তা শেয়ার করে নেওয়া হয়েছে সোনম ওয়াংচুকের তরফ থেকে। সেখানে লেখা হয়েছে, 'সোনমের তরফ থেকে বার্তা.. আজাদির দ্বিতীয় আন্দোলন....ভয়মুক্ত ভারত, অন্যায়মুক্ত ভারত২০ জুলাই.. পেপাল লিকের মতো অবিচারের থেকে মুক্তি। ভয় থেকে মুক্তি, আমায় বেআইনিভাবে তুলে আনা। ভারতের স্বাধীনতার জন্য দ্বিতীয় লড়াই। পার্লামেন্ট অবধি পদযাত্রা... আপনারা যোগ দিয়ে এটাকে সফল করুন।

সোনমের স্ত্রী গীতাঞ্জলি বলেছেন, দেশের সর্বত্র এই আন্দোলন হবে। কিন্তু তার জন্য অনুমতি প্রয়োজন তাঁরা জানেন না? লিখিত অনুমতিই নিতে হয়। মুখে বললে কিভাবে হবে? পুলিশ তো আইন মোতাবেক তাদের অ্যারেস্ট করবে। কেন সেটা হতে দেওয়া হবে? সোমবারই সংসদে শুরু হচ্ছে বাদল অধিবেশন। সেই কথা মাথায় রেখেই সংসদ অভিমুখে মিছিল করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইবে বলে জানিয়েছে তারা। এদিকে দিল্লি পুলিশ বলছে, সংসদমুখী যে কোনও মিছিল থামিয়ে দেওয়া হবে। সংসদ এবং তার আশপাশের এলাকা উচ্চনিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে পড়ে। সেই এলাকায় এ ধরনের কোনও কর্মসূচি আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, মধ্য দিল্লিতে যানজটের আশঙ্কাও থাকে। সেই কারণে সংসদ অভিযানের মতো কোনও কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হবে না। যদি বড় কোনও মিছিল সংসদের দিকে এগোয়, তবে সেটা আটকে দেওয়া হবে।
কিছুটা হলেও এই পরিকল্পনায় কিছুটা খামতি রয়েছে বলেই আমি মনে করি। তবে আন্দোলনের নীতিগত দিক দিয়ে যে আবেদন, তার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ সহমত। এখন দেখার- আগামীকাল ঘটনা কোন দিকে মোড় নেয়!