
স্বর্ণালী গোস্বামী
16 Aug 2026
আমাদের উচিত রাজা সেন কে আরও বেশি করে খোঁজার চেষ্টা করা। তাঁর কাজ, কাজের ভাবনা, পরিধি বিভিন্ন ফিল্ম স্কুলে পাঠ্য হিসেবে নির্বাচন করা
রবিবার কলকাতার এসএস কেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র পরিচালক রাজা সেন। বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তাঁর মৃত্যুতে টলিপাড়ায় একটা যুগের অবসান হল। শোকস্তব্ধ গোটা বিনোদন জগৎ। আর্থিক সাফল্যের চেয়েও শৈল্পিক সত্তা আর ভালো মনটাই ছিল তাঁর বড় পরিচয়। চলতি বছরের শুরুতে কোমরে অপারেশন হয় তাঁর। পরে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। বিগত দু’দিন ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
চলচ্চিত্রের ক্যানভাস থেকে ছোট পর্দা, সর্বত্রই রাজা সেন রেখে গিয়েছেন তাঁর অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর। ১৯৯২ সালে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্রের উপর নির্মিত তথ্যচিত্রের জন্য পরিচালক হিসেবে প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান তিনি। পরবর্তীতে ‘দামু’ -র জন্যেও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন। ‘দেশ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘আত্মীয়-স্বজন’, ‘তিন মূর্তি’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘মায়া মৃদঙ্গ’, ‘দীপশিখা’-র মতো সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি বাংলার চলচ্চিত্র জগৎকে। পরবর্তী সময়ে ‘আত্মীয় স্বজন’ ছবির জন্যও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। ১৯৯৭ সালে তাঁর পরিচালিত ধারাবাহিক ‘সুবর্ণলতা’ টেলিভিশন জগতের ইতিহাস গড়ে তোলে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এছাড়াও ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘তারাশঙ্করের ছোট গল্প’-এর মতো ধারাবাহিক তাঁর পরিচালনায় জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
কয়েক বছর আগে ‘মায়া মৃদঙ্গ’ ছবির শুটিং চলাকালীন পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর চোট পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সেই আঘাতের কারণে চলাফেরা করতেও সমস্যা হচ্ছিল। গত কয়েক বছর ধরে স্বাভাবিক ভাবে হাঁটাচলা করতেও সমস্যা হচ্ছিল। চলতি বছরের শুরুতে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। তাঁর শরীরের নিম্নাংশ অবশ হতে শুরু করলে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জটিল স্নায়বিক সমস্যার কথা জানতে পারেন। অস্ত্রোপচারের পরে কিছুটা সুস্থ হলেও পরবর্তী সময়ে ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন পরিচালক। অগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল তাঁকে।
তিনি যখন তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, তখন তাঁর বিষয় কেবল একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিল না, সেই মানুষটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা সময়, একটা সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজও হয়ে উঠেছে ছবির বিষয়। তাঁর তথ্যচিত্রের তালিকায় যেমন বিষয় হয়েছেন সুচিত্রা মিত্র, তপন সিংহ, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময়ী দেবী এবং সমরেশ বসুর মতো ব্যক্তিত্ব, পাশাপাশি এসেছে কলকাতার ইতিহাস, সুন্দরবন, লোকসংস্কৃতি ‘আলকাপ’-এর মতো বিষয়ও। রাজা সেনের তথ্যচিত্র সুচিত্রা মিত্রকে বাংলা সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিসরের একজন মানুষ হিসেবে নথিবদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে। ফলে ছবিটি শুধুমাত্র একজন শিল্পীর জীবনী হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার একটি সময়ের দলিল। তপন সিনহা-কে নিয়ে তথ্যচিত্রে একজন পরিচালকের অন্তরাত্মার খোঁজ করেছিলেন আর একজন পরিচালক। 'ফিল্মমেকার ফর ফ্রিডম' নামে তথ্যচিত্রে রাজা সেন তুলে ধরেছিলেন পরিচালক তপন সিনহার সৃষ্টিশীল মনন। এছাড়াও শম্ভু মিত্রকে ক্যামেরায় ধরে রাখা মানে শুধু একজন নাট্যব্যক্তিত্বের জীবন সংরক্ষণ নয়। বাংলা গ্রুপ থিয়েটার, অভিনয়ের ভাষা, মঞ্চভাবনা—একটি বিশাল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা। 'শম্ভু মিত্র' নামাঙ্কিত তথ্যচিত্রটি ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টারের জন্য নির্মিত এবং প্রায় তিন ঘণ্টার ডকুমেন্টেশন হিসেবে তালিকাভুক্ত। রাজা সেনের তথ্যচিত্রের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর সাহিত্যকেন্দ্রিক কাজ। তিনি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেন সাহিত্য আকাদেমির জন্য। পরে সমরেশ বসুকে নিয়েও কাজ করেন। রাজা সেনের তথ্যচিত্রের তালিকায় রয়েছেন সাহিত্যিক জ্যোতির্ময়ী দেবীও। একইসঙ্গে ১৯৯০ সালে পাঁচ পর্বের ‘ইতিহাসের কলকাতা’ তৈরি করেছিলেন তিনি, যেখানে শহরের নানা দিক উঠে এসেছিল। পরে সুন্দরবন, নৃতাত্ত্বিক বিষয়, কলকাতার শব্দদূষণ, কুমোরটুলির পরিবর্তন—এমন বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ও তিনি নিজের ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন। রাজা সেনের 'আলকাপ এ ডায়িং ফোক কালচার' এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলকাপ বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার কথা বলে, যা ক্রমশ মৃতপ্রায়। রাজা সেন সেই সংস্কৃতির ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে তথ্যচিত্রে ধরেছিলেন। ছবিটির জন্য ২০০৫ সালে BFJA-র সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কারও পান তিনি।
গান, সিনেমা, থিয়েটার, কবিতা, কথাসাহিত্য—বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনের কোনও একটি শাখায় নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি। বরং যাঁরা তাঁদের নিজস্ব ক্ষেত্রে একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাঁদের কাছে বারবার ফিরে গিয়েছেন। হারিয়ে যাওয়া সময়কে শৈল্পিক এবং তথ্যনিষ্ঠ দৃষ্টিতে সংরক্ষণ করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা করে গেছেন তিনি বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে দিয়ে। তাঁর তথ্যচিত্রগুলি এককথায় বাংলা শিল্প ও সংস্কৃতির ইতিহাসের এক শৈল্পিক দলিল৷
আমাদের উচিত রাজা সেন কে আরও বেশি করে খোঁজার চেষ্টা করা। তাঁর কাজ, কাজের ভাবনা, পরিধি বিভিন্ন ফিল্ম স্কুলে পাঠ্য হিসেবে নির্বাচন করা। বিভিন্ন ধরনের বিষয়ের মধ্যে দিয়ে তিনি যেভাবে সমাজের একটি বৃহৎ পরিসরকে নিজের ক্যামেরায় ধরে রেখে গিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থেকে যাবে। তবে শেষে একটা আক্ষেপ রেখে যাব। এই ধরনের মানুষগুলো আজকের সময়ে গুরুত্ব পাননা। নতুন করে কাজ করতে পারেন না, প্রযোজকের অভাবে। মনের ভেতরে কষ্ট নিয়ে চলে যেতে হয়। ধীরে ধীরে সমাজ যেদিকে এগিয়ে চলেছে, সেখানে শুধু বাগাড়ম্বরদের স্থান হচ্ছে, সত্যিকারের শিল্পীরা নিজেদের প্রকাশ করতে পারছেন না। যা গোটা শিল্প জগৎ এবং অবশ্যই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিরাট ক্ষতি।