top of page

কলকাতায় আবার চলবে ট্রাম, নতুন কলেবরে

স্বর্ণালী গোস্বামী

5 Jul 2026

আমরা আশা করি দেখতে পাব- শহরে ফের ট্রাম চলছে নিজস্ব ঢঙে কিন্তু নতুন মহিমায়

মাসের শুরুতেই মন ভালো করা খবর। গত মাস থেকেই পরিবহন মন্ত্রী ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কলকাতায় কিভাবে ট্রাম ফিরিয়ে আনা যায়, তা তিনি ভাবছেন। এবারে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমরা আশা করি দেখতে পাব- শহরে ফের ট্রাম চলছে নিজস্ব ঢঙে কিন্তু নতুন মহিমায়। একসময় যে প্রায় ৭০ টি রুটে ট্রাম চলত, সেসব রুটেই আবারও ট্রামকে স্বমহিমায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার ৷ বুধবার অর্থাৎ পয়লা জুলাই তেমনটাই জানান রাজ্যের পরিবহণ অর্জুন সিং। পাশাপাশি ভাবা হচ্ছে ওভারহেড তার ছাড়াই ব্যাটারিচালিত ট্রাম চালানোর কথা।

আমরা উত্তরবঙ্গের মানুষ। ছোট থেকেই কলকাতায় যাতায়াত। সেই ছোট্টবেলার কথা মনে পড়ে, ১৯৮১/৮২ সাল। বাবা পুজোর পর পর পান্ডু গেল ট্রেনিং নিতে। সেই বছরই বড় মাসিমনির বিয়ে হয়ে গেছে। রায়গঞ্জে যেতে চাইছেনা মা। বাড়ি ফাঁকা লাগবে বলে। মায়ের একেবারে কাছের ছিল মাসিমনি সেই ছোট থেকে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, অনেকদিন কলকাতায় যাওয়া হয়না, তাহলে সেই ছুটিটা কলকাতায় কাটানো যাক। বাবা আমাদের দাদুর বাড়ি শিয়ালদা'য় রেখে গেল। সেবারই প্রথম ট্রামের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি তখন স্ট্যান্ডার্ড- থ্রি। শিয়ালদা থেকে কলেজ স্কোয়ার গিয়েছিলাম ট্রামে করে। আগে- পরে আর গিয়েছিলাম কি না মনে নেই। শুধু সেই দিনের কথা মনে আছে। রাস্তার ওপর দিয়ে ট্রেন চলতে দেখে ভারী অবাক আর মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার প্রথম ট্রাম চড়া। তারপর অনেকবারই এসেছি, কাকুর বাড়িতে তবে ট্রাম আর চড়া হয়নি। কারন কাকুর বাড়ি ছিল দমদম ক্যান্টনমেন্টে। সেখানে ট্রামের ব্যাপার ছিলনা।

এলাম ২০১০ সালে নিজের সংসার নিয়ে, ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। মেট্রো যেমন চড়েছি অফিস করতে গিয়ে রোজ, অফিস ছাড়ার পরে ট্রামেও চিত্তরঞ্জন অ্যাভেন্যিউয়ের কোয়ার্টারে ফিরেছি প্রায় রোজ, তেমন কোনও তাড়া না থাকলে। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মাঝে- মধ্যে। দুলকি চালে ঢং ঢং আওয়াজ করতে করতে ট্রামের এগিয়ে চলা বর্তমানে সাংঘাতিক একটা নস্ট্যালজিয়া আমার কাছে। কোয়ার্টারে থাকতে টুক করে কলেজ স্ট্রিট কি রাজাবাজার তাও গেছি কখনও- সখনও মেয়েকে নিয়ে। তখন থেকেই দেখতাম (বিশেষ করে এই কলেজ স্ট্রিটের রুটে) আশপাশ থেকে ট্রামকে নিয়ে টিটকিরি দিচ্ছে সেই অঞ্চলের স্থানীয় মানুষজন। রাস্তার অন্যান্য যানবাহনের যাতায়াতের অসুবিধে করছে এই শ্লথ গতির যান, সেটাই ছিল মূলতঃ অসহিষ্ণুতার কারন। তারপর বেহালায় এসে অনেকবার বিশেষ করে পুজোর ভিড়ে টালিগঞ্জ /রাসবিহারী থেকে গড়িয়াহাট ট্রামে চেপে গেছি। বাসের তুলনায় ট্রাম ফাঁকা থাকত। যেমন দেখেছিলাম কালীঘাট, হাজরা হয়ে খিদিরপুর নতুন ট্রাম লাইন পাতা হল, ট্রাম যাতায়াত শুরু করল কালীঘাট থেকে খিদিরপুর বা টালিগঞ্জ থেকে খিদিরপুর অব্দি। টালিগঞ্জ থেকে খিদিরপুর আসার জন্য দুটি ট্রাম রুট ছিল। ২৯ এবং ২৯/৩৬। ২৯ নং রুটে টালিগঞ্জ থেকে ছেড়ে রাসবিহারী, কালীঘাট, মোমিনপুর, খিদিরপুর হয়ে ধর্মতলা চলে যেত। এদিকে ২৯/৩৬ টি একই রুটে খিদিরপুর এসে, তারপর চলে যেত খিদিরপুর ট্রাম ডিপোর দিকে। তেমনিই ধীরে ধীরে চোখের সামনে এক এক করে রুটে বন্ধ হতে থাকল ট্রাম। কালের গর্ভে হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, শুধু হেরিটেজ রান করবে এসপ্ল্যানেড- ভিক্টরিয়া এলাকায়। চারদিকে ট্রামপ্রেমী মানুষেরা আন্দোলন শুরু করলেন, কিন্তু সরকার এক গোঁ ধরেই বসে রইল। এখন কোনরকম মাত্র দু'টি রুটে ট্রাম পরিষেবা। বর্তমানে শ্যামবাজার থেকে এসপ্ল্যানেড (৫ নম্বর রুট) এবং গড়িয়াহাট থেকে মল্লিকবাজার হয়ে এসপ্ল্যানেড (২৫ নম্বর রুট) পর্যন্ত মাত্র এই দু'টি রুটে অনিয়মিতভাবে ট্রাম চলে। দুর্নীতির কথা আর এখানে নাই বা বললাম! ২০২৩ সালে ট্রামের ১৫০ বছরে অনুষ্ঠান হল। অস্ট্রেলিয়া থেকে সেখানকার ট্রামের সঙ্গে জড়িত লোকজনেরা এলেন। আমিও গিয়েছিলাম ভিডিও করে সময়টাকে ধরে রাখতে, কিন্তু তাই করে তো ট্রাম ধরে রাখা যায়না!





নতুন সরকার এসেই ট্রাম নিয়ে নতুন করে ভাবনা- চিন্তা করছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। 'মার্চেন্টস চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি' বা MCCI এর উদ্যোগে ১ জুলাই কলকাতায় একটি বিশেষ সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় ৷ পরিবহণ ও শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং-এর উপস্থিতিতে আয়োজিত এই বিশেষ অধিবেশনের মূল বিষয়বস্তু ছিল 'Vision for New Transportation System in West Bengal'। কলকাতার পরিবেশবান্ধব এই যানকে পুনরুজ্জীবিত করতে 'রেল ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক সার্ভিস' বা রাইটস-এর দ্বারস্থ হয়েছে নতুন রাজ্য সরকার। পাশাপাশি, এই ঐতিহ্যবাহী যানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে ইউনেস্কোর কাছেও আবেদন জানানোর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবহন মন্ত্রী অর্জুন সিং বলেন,"আমরা কলকাতার রাস্তায় পরিবেশবান্ধব যান ট্রামকে ফিরিয়ে আনতে চাই। কলকাতার সমস্ত ট্রাম রুট পর্যালোচনা করে রাইটসকে দ্রুত রিপোর্ট পেশ করতে বলা হয়েছে ।" তিনি আরও বলেন, "প্রথম দফায় শহরের ট্রাম রুটগুলিকে সংস্কার করে চালু করা হবে। আগের পুরোনো মডেলের নয় বরং একেবারে অত্যাধুনিক মানের এবং প্রযুক্তিতে তৈরি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ট্রাম চলবে।" ট্রামকে ধর্মীয় পর্যটনেও ব্যবহার করার অভিনব উদ্যোগ নিতে চলেছে পরিবহণ দফতর। কালীঘাট থেকে দক্ষিণেশ্বরের মধ্যে একটি বিশেষ করিডর তৈরি করে আধ্যাত্মিক স্থানগুলিকে এক সুতোয় বাঁধার পরিকল্পনা রয়েছে ৷ পাশাপাশি, ধাপে ধাপে সল্টলেক এবং নিউটাউন পর্যন্ত ট্রামপথ সম্প্রসারণের প্রস্তাবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নতুন এই ট্রামগুলি রাস্তার মাঝখান দিয়ে নয়, বরং রাস্তার একেবারে বাঁদিক ঘেঁষে চলাচল করবে। এর জন্য নতুন করে ট্রামলাইন পাতার কাজও খুব শীঘ্রই শুরু হতে চলেছে। বিদেশের ধাঁচে তৈরি এই ট্রামগুলি চলবে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি প্রযুক্তির সাহায্যে, যার ফলে একদিকে যেমন দূষণ কমবে, অন্যদিকে বাঁচবে জ্বালানিও। সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে ঐতিহাসিক এসপ্ল্যানেড-খিদিরপুর রুটটি।

পরিবহণ দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘কলকাতায় ট্রাম চলছে ব্রিটিশ আমল থেকে। এই সময় থেকে এখনও পর্যন্ত কলকাতা ট্রামের কোন প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়নি। ট্রামকে সময়োপযোগী করে তুলতে প্রযুক্তির উন্নয়ন প্রয়োজন। তাই অস্ট্রেলিয়া এবং ফ্রান্সের দু’টি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তাদের সঙ্গে সমীক্ষার কাজ করবে রাইটস।" ওভারহেড তার ছাড়াই ট্রাম চালানোর উদ্যোগ নিতে চলেছে সরকার। আর আমরাও অপেক্ষা করতে থাকি নতুন রূপে ট্রামকে দেখার জন্য।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page