
স্বর্ণ ালী গোস্বামী
20 Sept 2026
নিজের রাজনৈতিক পর্বের অভিজ্ঞতার রেশ ধরে রাখলেন শতবর্ষ আগে প্রকাশিত 'পথের দাবী' উপন্যাসে| উপন্যাসটির প্রকাশের এবছর শতবর্ষ
ঢাক- ঢোল পিটিয়ে হলেই ভালো হত। কিন্তু তবু কিছু কিছু অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পালিত হচ্ছে বাংলার, বাঙালির অত্যন্ত কাছের সাহিত্যিক, কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম সার্ধশতবর্ষ। হুগলির দেবানন্দপুরে, রাজ্য সরকারের তরফে ১৬, ১৭ এবং ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মভিটেতে উদযাপিত হল জন্ম সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে তিন দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান। লেখকের ছেলেবেলার অনেক স্মৃৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই জায়গার সঙ্গে ৷ ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এখানেই তাঁর বাল্যজীবন এবং প্রাথমিক পর্যায়ের পড়াশোনা। এখানকার স্মৃতিকে সঙ্গী করেই 'কাশীনাথ', 'রাজলক্ষী শ্রীকান্ত'র মতো সাহিত্য রচনা করেছিলেন শরৎচন্দ্র। এখানকার সরস্বতী নদী, ঠাকুর দালান, শিব মন্দির, বিশালাক্ষী মন্দির, প্যারি পণ্ডিতের পাঠশালা, গড়ের জঙ্গল, সরস্বতী নদীর বাঁশের ব্রিজ প্রভৃতি অনেক জায়গা আমরা দেখতে পাই তাঁর বিভিন্ন রচনার মধ্যে। দেবানন্দপুরে থাকার সময় তিনি 'কাশীনাথ' রচনা করেছিলেন।
তবে শুনতে খারাপ লাগলেও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের রাজ্য তাঁর স্মৃতিবিজড়িত এই জন্মভিটের বা জন্মস্থানের গুরুত্ব অনুধাবন করে তেমন কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। শরৎচন্দ্র বাঙালির লেখক হলেও তিনি শুধু ভারতে নন, গোটা বিশ্বে সমাদৃত তাঁর অবিস্মরণীয় লেখনীর মাধ্যমে। তাঁর রচিত নারীচরিত্রের মধ্যে সেই সময়কার নারীরা যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তেমনি আজকের যুগেও নারীরা নিজেদের খুঁজে পান স্বকীয় এক দৃষ্টিভঙ্গিতে। সমাজের প্রতিও ছিল তাঁর স্বাধীন, সংস্কারমুক্ত ভাবধারা, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
লেখকের স্মৃতিবিজড়িত এই গ্রাম সাহিত্য চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা ছিল। পর্যটকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান হতে পারত এই এলাকা। তার কিছুই হয়নি ৷ পূর্বতন সরকারের আমলে পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করার কথা ছিল দেবানন্দপুরের। কথাশিল্পীর জন্মভিটে ও অডিটোরিয়াম সংস্কার ছাড়া সেভাবে কিছু হয়নি। 'প্যারি পণ্ডিতের পাঠশালা'র এখনও কোনও সংস্কার হয়নি। সেখানে জমি জটিলতার জন্য সমস্যা রয়েছে। সঠিক কাগজ পত্র দেখাতে পারেননি জমির মালিক। তার জন্য কিছু করা যায়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থাও সেভাবে উন্নত নয়। মানুষের আশা, পর্যটনের জন্য ঢেলে সাজানো হোক শরৎ স্মৃতি-বিজড়িত দেবানন্দপুরকে। সাহিত্য চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তৈরি করা হোক সাহিত্যের এই পীঠস্থানকে। এলাকার রাস্তাঘাট আরও উন্নত হওয়া দরকার। বিভিন্ন শো'য়ের মাধ্যমে তাঁর আদর্শ ও লেখা সামনে আনা দরকার। তবে এখানে শরৎচন্দ্রের মূর্তি ও সেমিনার হলের সংস্কার হয়েছে। দেবানন্দপুর স্মৃতি মন্দিরে শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস সংরক্ষিত আছে । শরৎচন্দ্রের জীবনী তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন মডেলের মাধ্যমে।

১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাগনানের সামতাবেড় গ্রামে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে পালিত হয় তাঁর জন্ম সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠান। এখানেও শরৎচন্দ্রের বাড়িকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং দেউলটি স্টেশনের নামকরণ নিয়ে উঠল নতুন দাবি। কলকাতার নন্দনেও চলেছে ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর, দু'দিনব্যাপী বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠান।
গোটা সাহিত্যজীবন জুড়ে অজস্র ঘটনা-পরম্পরার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তিনি। খ্যাতির তুঙ্গে, পাঠকের নয়নমণি হয়ে বিরাজ করছেন যখন, সে সময়েও নিন্দা, দুর্নাম কুড়িয়েছেন। যদিও তার নেপথ্যে তাঁর নিজের দায়ও কোনও কোনও ক্ষেত্রে অস্বীকার করার উপায় নেই। সাহিত্যসৃষ্টির শুরুর দিক থেকেই রবীন্দ্রনাথের উপর তাঁর অভিমান ছিল। তাঁকে স্বীকার না-করার অভিমান। তাঁর 'নিষ্কৃতি' উপন্যাসটিকে যখন ১৯৪৪ সালে অনুবাদ করলেন দিলীপকুমার রায়, সে- অনুবাদের সংশোধন করেছিলেন শ্রীঅরবিন্দ। আর ভূমিকা লিখে দিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি লিখলেন –“সাহিত্যিকের যা সর্বোত্তম পারিতোষিক তা তিনি পেয়েছেন। বাঙ্গালী পাঠকের মন তিনি সম্পূর্ণ জয় করেছেন।” এই প্রাপ্তি অবশ্যই কথাসাহিত্যিকের আক্ষেপকে আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। ২০২৬ সালটি আর-একটি কারণেও তাৎপর্যপূর্ণ। শরৎচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাস 'পথের দাবী' গ্রন্থরূপে প্রকাশের শতবর্ষ এ বছর। দেশ জুড়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে- প্রশ্ন, যে- সংশয়, যে- অনুসন্ধান, স্বাধীনতা- পূর্ব বিপ্লবের ডাক যেন সেই উদ্দেশ্যেই ধাবিত হয়েছিল। শরৎচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাস পথের দাবী সেই ধারার পথিকৃৎ। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও এই উপন্যাসের ভূমিকা যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। কতগুলি ভারতীয় ভাষায় যে অভিনীত হয়েছে শরৎচন্দ্রের 'দেবদাস', তা জানলে বিস্মিত হতে হয়। আদর্শ প্রেমিকের এমন নজির আর কোনও বাঙালি সাহিত্যিক রাখতে পারেননি বলেই মনে হয়। স্রষ্টারূপে এই চরিত্রটি নিয়ে তিনি এত দূর সংবেদনশীল ছিলেন যে, প্রথমে প্রমথেশ বড়ুয়াকে দেবদাস চলচ্চিত্রায়ণের অনুমতি দিতে চাননি– বলেছিলেন, “আমার দেবদাস বড় ভাবুক। তাকে চলচ্চিত্রায়িত করা বড় সহজ কাজ নয়।” যদিও পরে অনুমতি দেন। জানা যায়, চলচ্চিত্রটি দেখে প্রমথেশ বড়ুয়াকে আন্তরিক আশীর্বাদও করেছিলেন। ছদ্মনামে তাঁর রচিত 'নারীর মূল্য'- তে প্রায় সমস্ত পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে যে ডিসকোর্স শরৎচন্দ্র নির্মাণ করেছেন, তার নিরিখে মেয়েদের প্রতি বিশেষত তাদের জীবনব্যাপী যন্ত্রণা, বঞ্চনা আর নিরবচ্ছিন্ন শোষণ সম্পর্কে তাঁর আন্তরিক সহমর্মিতা সম্পর্কে কোনও সন্দেহ থাকে না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য ‘নারীর মূল্য’ রচনায় শরৎচন্দ্রের সেই অকাট্য যুক্তি–“স্ত্রী-ত্যাগ বলিয়া একটা ব্যাপার যখন আমাদের মধ্যে আছে, তখন উভয় পক্ষেই ও- জিনিসটা কেন থাকা উচিত নয়, তাহা বলিতে পারি না”। মুন্সীগঞ্জের সাহিত্য-সভায় সভাপতির অভিভাষণে তিনি নিজেই বলেছিলেন, “‘পল্লীসমাজ’ বলে আমার একখানা ছোট বই আছে। তার বিধবা রমা বাল্যবন্ধু রমেশকে ভালোবেসেছিল বলে আমাকে অনেক তিরস্কার সহ্য করতে হয়েছে। একজন বিশিষ্ট সমালোচক এমন অভিযোগও করেছিলেন যে, এত বড় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিলে গ্রামে বিধবা আর কেউ থাকবে না। ইহার প্রশ্রয় দিলে ভাল হয় কি মন্দ হয়, হিন্দু- সমাজ স্বর্গে যায় কি রসাতলে যায়, এ মীমাংসার দায়িত্ব আমার উপরে নাই।"
ছেলেবেলা থেকেই ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন শরৎচন্দ্র। ঘরের থেকে বাইরের দিকেই তাঁর মন ছিল বেশি। আঠারো বছর বয়সে মাতৃহীন হয়ে, ভাগলপুরের মামাবাড়ির পাট চুকিয়ে তাঁরা চলে আসেন ভাগলপুরের কাছেই খঞ্জরপুর গ্রামে। পিতা তাঁকে 'ভুবন' নামে ডাকতেন। ‘ভুবন’ ছাড়াও শরৎচন্দ্রের আরও দু’টি ডাকনাম ছিল–‘ন্যাড়া’ এবং ‘শোরো’। মা ভুবনমোহিনী দেবী ‘ন্যাড়া’ বলতে অজ্ঞান ছিলেন। ‘ন্যাড়া’ নামেই গ্রামের সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন তিনি। বিশেষ করে বাল্যকালে। দেবানন্দপুর ও ভাগলপুর– দুই জায়গাতেই এই বালকের খ্যাতি ছড়িয়ে ছিল তাঁর দুষ্টুমির জন্য। সেই দুষ্টুমি বৈচিত্রময়, দুঃসাহসিক– 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের নানা কাহিনি, 'লালু'র নানা গল্পের আদল আছে তাতে। পোষ্য-অন্তপ্রাণ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পশুক্লেশ নিবারণী সমিতির সভাপতি। ভারত জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যোগ দিয়েছিলেন তাতে। 'বাজেশিবপুর নিবাসী কথাশিল্পী হাওড়া জেলার কংগ্রেস সংগঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শরৎচন্দ্র বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির এবং নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটিরও সভ্য নির্ব্বাচিত হয়েছিলেন। এই সকল পদাধিকার-বলে তিনি হাওড়া জেলার, বাংলাদেশের এবং ভারতবর্ষের কংগ্রেস আন্দোলনের একজন প্রধান কর্মী হয়ে দাঁড়ালেন।' - লিখেছেন প্রত্যক্ষদর্শী শচীনন্দন চট্টোপাধ্যায়। শুধু অসহযোগ আন্দোলন নয়, কংগ্রেসের সমস্ত রকম গঠনমূলক কাজেই অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। নিজের জেলায় কংগ্রেসের যাবতীয় দায়িত্ব সামলে শরৎচন্দ্র প্রতিদিন দেশবন্ধুকে সহায়তা করতে কলকাতায় যেতেন। চিত্তরঞ্জনেরও পরম ভরসা ও আস্থা ছিল শরৎচন্দ্রের উপর। নানা রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে আলোচনা হত দুই মনীষীর মধ্যে, এছাড়া দেশবন্ধুকে সংবাদপত্রে যে সকল বিবৃতি মন্তব্য আবেদন প্রভৃতি বাংলা ভাষায় প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ করতে হত তার অধিকাংশই শরৎচন্দ্র রচনা করে দিতেন। তবে সংবাদপত্রে নিজের নাম জাহির করা, ছবি ছাপানো, এসব তিনি কখনো করেননি। যদিও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রয়াণের পর ধীরে ধীরে রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা কমে এসেছিল। নিজের রাজনৈতিক পর্বের অভিজ্ঞতার রেশ ধরে রাখলেন শতবর্ষ আগে প্রকাশিত 'পথের দাবী' উপন্যাসে।