top of page

একের পর এক অসহিষ্ণুতার ঘটনায় বিচলিত সাধারণ মানুষ

স্বর্ণালী গোস্বামী

21 Dec 2025

আশা করব সময়ের নিয়ম মেনে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে

ছায়ানট সাংস্কৃতিক ভবনে ভাঙচুরের ঘটনায় ঢাকার ধানমন্ডি থানায় মামলা রুজু হল। পুলিশ জানিয়েছে, ছায়ানটের ম্যানেজার দুলাল ঘোষ শনিবার ৩০০ থেকে ৩৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছেন। বাংলাদেশ যখন পূর্ব পাকিস্তান, তখন ছায়ানট তৈরি হয়। তাদের নববর্ষ উৎসব ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু গত বছরের ৫ অগস্টের পালাবদলের পর থেকেই কয়েকটি কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বাংলা নববর্ষ উৎসব উদ্‌যাপনের বিরোধিতা করেছে প্রকাশ্যে। তারপর সময় এগিয়েছে, আর বাংলাদেশে কট্টরপন্থীরা সমানে অরাজক অবস্থার কারন হয়ে থেকেছে।

বহুদিন পর এই আড্ডায় লিখতে বসলাম। তাও বেশ রাত করেই। আসলে পারিবারিক অনুষ্ঠান, নিজের সমস্যা, শরীর ঠিক রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রচন্ড কাজের ব্যস্ততা- চাপ বলাই ভালো- সব মিলিয়ে একেকটা দিন টিক দিতে দিতে চলছিলাম, পরেরদিনের ভেবে রাখা কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য। নিজস্ব লেখা - যেটা কোর নিউজ নয়, তার জন্য একটু প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় আমার। লিখতে বসলে কথা চলে এলেও, তার বাঁধন তৈরির জন্য সময় দিতে হয়, যেটা মনের মধ্যে দানা বাঁধতে বাঁধতে এগোয়। সেটাই হয়ে উঠছিল না।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু বিষয় এসে গিয়েছে,যা নিয়ে বলা অবশ্য কর্তব্য ছিল। কিন্তু কি আর করা, হয়ে ওঠেনি। প্রথমেই বন্দে- মাতরম নিয়ে সংসদে আলোচনা। তা নিয়ে বেশ জল ঘোলা হয়েছিল। কেউ প্রধানমন্ত্রীর বঙ্কিম দা- বলা নিয়ে কটাক্ষ করছেন, তো কেউ বলছেন অবাঙালিরা কাউকে সম্মান দিলেও 'দা' বলে থাকেন। যেমন মান্না দা, হেমন্ত দা- প্রমুখ। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যখন এই বিষয়ে এমন দীর্ঘ একটি ভাষণ দিলেন, সেক্ষেত্রে তাঁকে আরও একটু হোমওয়ার্ক করে ছিল। যাতে বাঙালিদের আবেগে আঘাত না লাগে।

SIR নিয়ে তো নভেম্বর মাস থেকে একের পর এক খবর, যা নিয়ে রোজই এমন আড্ডার ঠেক জমানো যায়। তাছাড়াও ছিল কলকাতায় মেসি কান্ড। যেভাবে ছড়াল বিষয়টা, তা ভাবনার অতীত। কিছু রাজনৈতিক নেতার হঠকারিতা এবং অনুষ্ঠানের আয়োজকের অদূরদর্শিতার ফল ভুগতে হল আমাদের মত সাধারণ মানুষদের, বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষদের। গোটা পৃথিবীর কাছে মাথা হেঁট হয়ে গেল কলকাতার। মেসি নিজের ভারত ভ্রমণের বিষয়ে বলতে গিয়ে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে গেলেন কলকাতার অধ্যায়টি। যা অত্যন্ত লজ্জার। ঘটনার তদন্তে সিট গঠন করা হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। পুলিশের দাবি, ভিড় সামলানোর গাফিলতির পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। এছাড়াও মেসির কলকাতা সফরে শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান সূচিতে বদল আনা হয়েছিল। কিন্তু জানানো হয়নি পুলিশকে। বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে থাকা শতদ্রু দত্তের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে মোট প্রায় ২২ কোটি টাকা রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। আরও দাবি, অনুষ্ঠানের জন্য প্রথমে মাঠে প্রবেশের অনুমতি হিসেবে মাত্র ১৫০টি পাস ইস্যু করা হয়েছিল। তবে পরে কয়েকজন প্রভাবশালীর চাপে পড়ে সেই সংখ্যা বাড়াতে বাধ্য হন আয়োজকরা, এমনই তথ্য দিয়েছেন শতদ্রু দত্ত। তিনি আরও জানিয়েছেন, লিওনেল মেসির নিরাপত্তা টিম স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে অনুষ্ঠানের সময় ফুটবলারকে কোনওভাবেই স্পর্শ করা যাবে না। অভিযোগ, সেই সতর্কতা মানা হয়নি, যার জেরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ঘটনার দিন মাঠে ইভেন্ট পরিচালনার জন্য তাঁর সংস্থার প্রায় ১৫০ জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের আমন্ত্রিত প্রায় ৩০০ জন অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন বলে জেরায় জানিয়েছেন শতদ্রু। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়নি। পূর্বনির্ধারিত ফ্লো-চার্ট ভেঙে যায় এবং মেসির চলাচল কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বারবার ‘হাফ হাগ’ করা এবং অতিরিক্ত সেলফি তোলার চেষ্টা থেকেই মেসি ও তাঁর সঙ্গীরা বিরক্ত হন বলে জেরায় জানিয়েছেন শতদ্রু। মেসির ভারত সফরের মোট খরচ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা—যার সিংহভাগই গিয়েছে বিশ্বফুটবল তারকার পারিশ্রমিকে। মেসিকে একা এই সফরের জন্য দেওয়া হয়েছে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি ভারত সরকারকে কর হিসেবে দিতে হয়েছে আরও ১১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সফরের মোট ব্যয় দাঁড়ায় আনুমানিক ১০০ কোটি টাকায়।

এখন সিট তদন্ত করে দেখছে—কার নির্দেশে অতিরিক্ত প্রবেশপত্র দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে এতজন মাঠের ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় কাদের উপর বর্তায়। সেইমতোই তারা এগোচ্ছে।

সবশেষ যে ঘটনা আমাদের বাঙালিদের নাড়িয়ে দিয়েছে, তা হল ছায়ানটের ঘটনা। যা দিয়ে লেখার ভূমিকা শুরু করলাম। ছায়ানটের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে একদল লোক জোর করে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ছ’তলা ভবনে প্রবেশ করে। তার পরেই তারা ভাঙচুর শুরু করে। ভবনের একাংশে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। সেখানে যত সিসি ক্যামেরা ছিল, সব ভাঙা হয়। সব অডিটোরিয়াম, ঘর লন্ডভন্ড করা হয় বলেও বিবৃতিতে জানিয়েছে ছায়নট। বৃহস্পতিবার রাতে ওসমান হাদির মৃত্যুর পরে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে ছায়ানটে। অভিযোগ, কট্টর ইসলামপন্থী স্লোগান দিতে দিতে সংগঠিত ভাবে মিছিল করে গিয়ে সেখানে হামলা চালানো হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি-বই। ভেঙে ফেলা হয় অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রও। বিক্ষোভকারীরা ছিঁড়ে দেয় ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত সনজীদা খাতুনের ছবি। রেহাই পায়নি লালন, এমনকি বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ছবিও। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশের প্রথম সারির খবরের কাগজ 'প্রথম আলো'র কার্যালয় ও 'ডেইলি স্টার' ভবনে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মাঝেই ময়মনসিংহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় দীপুচন্দ্র দাসকে। অভিযোগ, খুনের পরে তার দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক টানাপড়েন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দীপুর হত্যাকাণ্ডে বিচারের দাবি তুলে বিবৃতি দিয়েছে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক।

কিন্তু নিজেদের প্রতিষ্ঠানে হামলার পেছনে ‘বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী’ ব্যক্তিরা জড়িত বলে ‘ধারণা’ করছে সাংস্কৃতিক সংগঠন—ছায়ানট। সংগঠনটি মনে করে, হাদির মৃত্যুর সূত্রে এ হামলা চালানো হয়নি। বাঙালি সংস্কৃতি-বিরোধী ব্যক্তিরা পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছে বলেই তাদের ধারণা। ছায়ানট বলছে, এটি স্বনির্ভর স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, একান্ত প্রয়োজনীয় কারন ছাড়া নিয়মিত কার্যক্রমের জন্য আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে অভ্যস্ত নয় তারা। ভবন আক্রান্ত হওয়ায় দেশ ও বিদেশের প্রাক্তনী ও শিক্ষার্থীসহ বিপুল সংখ্যক শুভাকাঙ্ক্ষীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বার্তা পেয়ে ছায়ানট অভিভূত। অনেকে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সমাজ ও সংস্কৃতির ‘এই সংকটকালে সর্বজনের পরামর্শ ও সব মহলের সংহতি’ প্রয়োজন বলে মনে করে ছায়ানট।

এদিকে এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতে, তথা রাজ্যের সর্বত্র সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ বিহ্বল হয়ে পড়েন। চারিদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাঙচুরের ছবি- ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিষয় ছিল। প্রচুর মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশে ছায়ানটের উপর হামলা- সহ অরাজকতার প্রতিবাদে সরব শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকরা।

বৃহস্পতিবার থেকে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে, তা নিয়ে রবিবারই প্রথম মুখ খোলে ভারত। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল একটি বিবৃতিতে বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নিবিড় ভাবে নজর রেখেছে ভারত। সে দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের আধিকারিকেরা যোগাযোগ রাখছেন। সংখ্যালঘুদের উপর হামলা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন— তা তাঁদের জানানো হয়েছে। দীপুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। ভারত সেই আবেদন জানিয়েছে।’’ শনিবার নয়াদিল্লির বাংলাদেশি দূতাবাসের সামনে ২০-২৫ জন যুবক জড়ো হয়েছিলেন। তাঁরা ময়মনসিংহে দীপুর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং স্লোগান দেন। রবিবার থেকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে চট্টগ্রামের ভারতের ভিসা আবেদন কেন্দ্র।


প্রসঙ্গত, এই ছায়ানট হল শিল্পী, সাহিত্যিক সনজীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক- সহ বিশিষ্টদের তৈরি শিল্প- সাহিত্য চর্চা কেন্দ্র ৷ যা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৷ বাংলা ভাষা, রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা, লালন সংস্কৃতি- সহ দেশীয় সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক শিল্পী লাইসা আহমদ লিসা বলেন, হামলা সত্ত্বেও ছায়ানট তার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে না। যত দ্রুত সম্ভব অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আবার কার্যক্রম শুরু করা হবে।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, ছায়ানটে এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আজ থেকে ৫৪ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে দেশের মেধা, মনন, সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করতে শিল্পী–সাংবাদিক–বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল, সেই একইভাবে আবার বিজয়ের মাসে দেশের সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপরে হামলা চালানো হলো। যারা হামলা চালালো, তারা তো একটা ঘরের মধ্যে ছিল। কি করছে, কেন করছে- তার কোনও সঠিক উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়না। একজন রাজনৈতিক যুবকের মৃত্যু ঘিরে একটা সাংস্কৃতিক ভবন ধ্বংস করা কেন? তার উত্তর কারো কাছে নেই। আশা করব সময়ের নিয়ম মেনে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। ছায়ানট তার হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করে এগিয়ে চলবে নিজের গরিমা বজায় রেখে।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page