top of page

আমরা বাঙালি, আমাদের ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট মেধাবী- এই কথাটা রাজনীতির কারবারিরা মনে রাখুন

স্বর্ণালী গোস্বামী

23 Aug 2026

হুমকি দিয়ে ছাত্রদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বোধ ইনজেক্ট করা যায়না

প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসেছেন রাজ্যে। ঘুরে গেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্যের সীমান্তরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করে ফিরেছেন। আজও রাজ্যে পাঁচ নতুন প্রকল্পের ভূমিপুজো হলো। গার্ডেনরিচ শিপ বিল্ডার্সে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের লক্ষ্যে এই ভূমিপুজো। ৩৪০০ কোটি টাকার যে পাঁচ প্রকল্পের ভূমিপুজো হয়েছে, সেগুলি হলো— রায়চক শিপইয়ার্ড, টিম্বার পন্ড শিপ বিল্ডিং ফেসিলিটি, দামোদর শিপ বিল্ডিং ফেসিলিটি, রেডিয়াল ফোর্জিং প্ল্যান্ট এবং ৩০০০ টন ওপেন ডাই ফোর্জিং প্রেস। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চান, ভারত প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পুরোপুরি আত্মনির্ভর হয়ে উঠুক। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সেই স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীও জানান, বাংলায় এই বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। রাজ্যের অর্থনীতিরও উন্নতি হবে। শুভেন্দুর কথায়, ‘এখানে প্রশিক্ষিত শ্রমিক আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো। অনেকেই কাজ পেতে পারেন।’

আমরা, রাজ্যের বীতশ্রদ্ধ মানুষ এটাই তো চেয়েছিলাম। রাজ্যের উন্নতি হোক। আবার যেন আমাদের রাজ্য অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। বিশ্বের দরবারে নিজেদের রাজ্য নিয়ে গর্ব করতে পারে। কিন্তু বিগত কয়েকদিন শহরে অন্য একটি ব্যাপার নিয়ে আমাদের মত সংবেদনশীল মানুষ যথেষ্ট আশাহত। আমি এই নিয়ে কোনওরকম লেখা লিখিনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি একটু পরিস্থিতি বিচার করায় বিশ্বাসী। ঠিক কোন পথে যাচ্ছে ঘটনাপ্রবাহ, তা নজরে রাখতে ভালোবাসি। তারপর কিছু বলতে ভালোবাসি। আগেরবার দিল্লিতে ছাত্র আন্দোলন নিয়েও আমার একই সিদ্ধান্ত ছিল। এবারেও তাই। তবে এবারে অর্থাৎ যাদবপুর কাণ্ডে তেমন তেমন অবাক হওয়ার মত আমার কাছে কিছু ঘটেনি, সেটাই আমি বলতে চাই।

গত বুধবার রাত থেকেই উত্তাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্রের খবর, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পড়ুয়ারা সাধারণসভার আয়োজন করায় আপত্তি তোলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণপন্থী সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ। তারপর রাতের অন্ধকারে বহিরাগতরা পাঁচিল টপকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে এবং যা নয় তাই তান্ডব চালায়। দেওয়াল বেয়ে উঠতে গিয়ে কোনও রাখঢাক না করে, ভাঙা হয় নন্দলাল বসু নির্মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম! পোড়ানো হয় পতাকা! উত্তাল হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। স্থানীয় বিধায়িকা সেখানে গিয়ে রীতিমতো হুমকি দিতে থাকেন ছাত্রদের। মূলত ২০২০ থেকে যাদবপুরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছেনা। তার ওপর এই সাধারণসভার আয়োজন অনেকে মনে করেছেন বেআইনি। সেই নিয়েই তান্ডবের সূত্রপাত। একশ্রেণীর শিক্ষকেরা মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ত্রুটিমুক্ত নয়। একদল তা সমর্থন করেন না। সন্দেহের তীর যাচ্ছে অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের (উচ্চশিক্ষা) সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য বুদ্ধদেব সাউ- এর ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ পড়ুয়াই অবশ্য ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পক্ষে। শুক্রবার বাম ছাত্র সংগঠন এবং এবিভিপি আলাদা করে এই তান্ডবের বিরুদ্ধে মিছিল বের করে। গত ১৯ এবং ২০ অগস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপকশুভশঙ্করের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছিল বাবা সাহেব অম্বেডকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অরুণাশিস গোস্বামী এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি-র অধিকর্তা সৌমেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে।

এবারে বলি, আমাদের রাজ্যের যাদবপুর এবং প্রেসিডেন্সি বরাবরই রাজনীতি প্রবণ বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তুমুলভাবে রাজনীতি হয়, তা সবাই জানে। যেটা আরও জানে, যে যাদবপুরে বাম সংগঠন যথেষ্ট সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রে। আরও যেটা উল্লেখযোগ্য বিষয়, তা হল রাজ্যের কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে যদি কিঞ্চিৎমাত্র গর্ব করার কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তা হল এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ই। এবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন- পাঠন ই বলুন বা গবেষণার দিক, যত দিন যাচ্ছে উন্নতি হওয়ার থেকে ধীরে ধীরে অবনতি হচ্ছে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি এবং বুঝতে পারছি। অর্থনৈতিকভাবে যতটা সাহায্য পাওয়ার দরকার রাজ্য সরকারের তরফে তা পাওয়া যাচ্ছেনা। যদিও নতুন সরকার আসার পর যাদবপুরকে উৎকৃষ্টমানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যা যথেষ্ট প্রশংসার বিষয়। কিন্তু আরও একটা ব্যাপার। আমাদের রাজ্যের আগের সরকারের মত বর্তমান সরকারও চাইছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের আধিপত্য বিস্তার হোক। কিন্তু তা বলে এভাবে চেঙ্গিস খানের মত আক্রমণ করে দখল করার চেষ্টা হবে? শর্বরী হুঙ্কার দেবেন? দিলীপ ঘোষ সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের হুমকি দেবেন? সবচেয়ে বড় কথা মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জাতীয়তাবাদ শেখাবার পথ বাতলে দেবার নিদান দেবেন?

আমার মন বলে, বলা ভালো আমার বুদ্ধি বলে এটা খুব অপ্রত্যাশিত নয়। দিল্লির জেএনইউ নিয়েও আমরা দেখেছি বিজেপি র স্ট্যান্ড কি! যাদবপুর সব দলের লক্ষ্য। কে নিজেদের দলে টানবে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবগাথা- তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হওয়া স্বাভাবিক। সিপিএম তথা বাম সংগঠন এই বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেই টিমটিম করে জ্বলছে। বর্তমানে শিক্ষিত পড়ুয়ারাই বাম আন্দোলনকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু বিজেপি চায় বিরোধীশূন্য রাজনীতি। সব দলই চায় যদিও। বিজেপিও তার অন্যথা নয়। তাই আই ওয়াশ করে বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদেরই লোকজনকে বিরোধী বানিয়ে শো কেসে সাজিয়ে রেখেছে। তাছাড়া কী মনে হয়? কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিকে কিছু টাস্ক দেয়নি জেতার পর? তারমধ্যে একটা এটাও। অর্থাৎ, যেভাবে হোক যাদবপুরে আমাদের দলের রাজত্ব কায়েম করতে হবে। তাই উঠে- পড়ে লেগেছে সকলে। নইলে এভাবে নেতারা বলতে পারতেন না।

আমি বলব, যারা ছাত্র, তাদের একটু দায়িত্ব নিয়ে এগোতে হবে এখন থেকে। একটু ডিপ্লোম্যাটিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের রাজ্যের মেধাবী ছাত্রদের বিরাট অংশ যাদবপুরেই পড়ে। সেখানকার শিক্ষকেরাও অন্যধারার শিক্ষা দেন ছাত্রদের। তাই এত উৎকৃষ্ট মানের ছাত্র উপহার পায় রাজ্য। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরোনো মানে বিশ্বের দরবারে একটা এক্সেলেন্স ক্যারি করা। তার মান রাখতে হবে। এই তান্ডব এখন হবেই মাঝে মাঝে। সেটা ভেবে নিয়েই এগোতে হবে। এখানে বহিরাগতদের আনাগোনা যথেষ্ট। সেটা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। সে বিষয়ে অধ্যাপকদের দায়িত্ব নিতে হবে। এর আগেও বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমরা দেখেছি এই অব্যবস্থা। তবু এখানকার কারো টনক নড়লনা। নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে নিজেরাই যদি সুরক্ষিত রাখতে না পারি, তাহলে এভাবে বার বার ভুলুন্ঠিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়। কাজেই দায়িত্ব নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনকে। রাজনীতির রমরমা পাশে সরিয়ে রেখে পড়াশোনার মানোন্নয়নের দিকে নজর বেশি দিতে হবে। ছাত্র রাজনীতি যেন ভবিষ্যতের নাগরিকদের বেপথে চালিত না করে, তার দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষকদের।

পাশাপাশি রাজ্যের সরকারের অবশ্যই দায়িত্ব বর্তায় কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিকরণ যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করা। হুমকি দিয়ে ছাত্রদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বোধ ইনজেক্ট করা যায়না। দেখান না দেখি অন্যান্য রাজ্য থেকে একটু অন্যভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই মেধাবী পড়ুয়াগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের রাজনীতিকে মর্যাদা দিয়ে, নিজেদের মতাদর্শে বিশ্বাসী করতে পারেন কি না। পুজো তো হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন হবেনা? জাতীয়তাবাদ অবশ্যই আছে সকলের মধ্যে। প্রত্যেকটা ছাত্র ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত বোধ করে। সেটা অনুভব করতে হবে। মেধাবী বর্তমান প্রজন্ম লাঠি তে নয়, যুক্তিতে বিশ্বাস করে। সেটাই করে দেখুন না। ঠিক সম্মান পাবেন আপনারা। সবাইকে নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে থাকতে দিন। দেখতে হবে, নতুন প্রজন্ম যে অন্ধকারের পথে পা বাড়াচ্ছে, তা যেন অবিলম্বে আটকাতে পারেন, তার জন্য রাজনৈতিক মতাদর্শকে আঘাত করার প্রয়োজন নেই। যুক্তির প্রয়োজন। সুরক্ষার প্রয়োজন। বহিরাগতরা যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অযথা অশান্তি পাকাতে না পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের ওপরেও বর্তায় বৈ কি। আর বাকি রইল নিজেদের রাজনৈতিক দলের দখলদারি। নির্বাচনের মাধ্যমেই সেটা করা যায় কি না দেখুন। কারন ওখানকার ছেলেমেয়েদের রাজনীতি করা থেকে কোনও রাজ্য সরকারই আটকাতে পারবেনা। তারা ওই মনোভাব নিয়েই পড়তে আসে ওই প্রতিষ্ঠানে। তাদের সমস্যা তাদের মত করেই সমাধান করতে দিন। নিজেদের মধ্যে সুস্থ লড়াই করে জিতে নিতে দিন নিজেদের অধিকার। যারা তা পারবে, তাদের স্বীকার করুন। সে যদি বাম সংগঠন হয়, তাও সেটাকে স্বীকার করতে শিখুন। কারন আমরা দেশের অন্যান্য রাজ্যের মত নই। আমরা বাঙালি। আমাদের গর্বের প্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েদের তাদের মত করে বাঁচার অধিকার দিন।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page