top of page

আনন্দপুর অগ্নিকান্ড

স্বর্ণালী গোস্বামী

1 Feb 2026

যাদের মানবিকতা বোধ আছে, তাদেরও অন্যকে লাথি মারা প্র্যাকটিস করতে হবে, নইলে সমাজের সত্যিকারের ব্যালান্স সম্ভব নয়

শহরের বুকে একটা ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে গেল। আমার কাজ খবর নিয়ে। এখন এতদিন ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে সব খবরই গা সওয়া হয়ে যায়। আসলে ছোটবেলা থেকেই আমি ভেতরে ভেতরে একটু সাহসী গোছের। মেয়েদের মত কথায় কথায় ভয় পেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলা মেয়ে আমি কোনোদিও ছিলাম না। আবার অন্য দিকে আমার অতি অল্পেতেই কান্না আসে, তবে সেটা মনের অন্তঃস্থলে কষ্ট হলে। কিন্তু যুক্তিদিয়ে বিচার করে দিনযাপন করা আমি অযৌক্তিক কোনও কিছুকেই ভয় পাইনা। ছোটবেলায় কল্পনার জগৎ থাকলেও রূপকথা আমার কোনওদিনও পছন্দের বিষয় ছিলনা আর সব মেয়েদের মতো। তো এ হেন মানুষ খবর নিয়ে কাজ করতে শুরু করি সামাজিক বিষয় নিয়ে। রাজনীতিতে শুরু থেকেই অনীহা ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তাও শুরু করলাম, ভাবনা, নিজের মত করে বিশ্লেষণ করা, অবশ্যই একজন সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতিকে আমি বিশ্লেষণ করতে ভালোবাসি। যেটাও আগে করতাম না। সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতাম রাজনীতি বিষয়টাকে।

কিন্তু এখনও কিছু কিছু ঘটনার ভয়াবহতা এবং নৃশংসতা মনকে নাড়া দেয় বৈ কি! সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, এটা নিয়ে কিছু বলা দরকার। এবং সেটা এতটাই আমার মনের জায়গা জুড়ে নেয়, যে ভাবতে বসি- অন্যভাবে কী কিছু হতে পারত না? হয়ত তেমনটা ওই ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কান্নাকাটি করা মেয়েগুলো ভাবতেই পারবে না। সে গভীরতায় তারা পৌঁছতেই পারবে না। হ্যাঁ, একটু কলার তোলা গোছের মনে হলেও আমি এই বয়সে দাঁড়িয়ে নিজের সম্বন্ধে এমনই ভাবি। দাপিয়ে জীবন কাটানোর মনও মাঝে মাঝে বিষন্ন হয় কিছু ঘটনায়। আনন্দপুরের ঘটনাও অনেকটা সেই রকম। রাত ৩টেয় আগুন লাগে রবিবার। সেই আগুনের রেশ চলে সোম পেরিয়ে মঙ্গলবার অব্দি। ভাবা যায়? জাস্ট যদি ভাবি, ওই বিধ্বংসী আগুনের গ্রাস! অতগুলো প্রাণ! ঠুনকো জীবনের মূল্য! অমানুষ তার মধ্যেও হাসতে হাসতে জীবন কাটায় কীভাবে? একটু মনে হয় না, ছন্দ থেকে বিরতি নিই? একটু ভাবি? জাস্ট ছাই হয়ে গেল মানুষগুলো! কে তার বাবা, তা পরীক্ষা করার জন্য বাচ্চা একটা মেয়েকে আনা হয়েছে ল্যাবরেটরিতে। যে মেয়েটি জানেই না, তার সাথে কী হতে চলেছে! 'অরিত্র দত্ত বণিক' ছবি সহ পোস্ট করেছে বিষয়টা। দিনযাপনের জন্য পোশাকের মত পাল্টে ফেলতে হয় বিষয়। নইলে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবেনা, দৈনন্দিন জীবনে। প্রতিদিন টিক দিতে হবে- আগে থেকে ভেবে রাখা কাজগুলোয়। কিন্তু ভাবনা তো মরে না! তাকে জিইয়ে রাখতে হয়, নিজেকে মানুষ হিসেবে নিজের কাছে জবাবদিহি করতে হবে নইলে। থেকে যায় ও। টানা তিন দিন পরিশ্রম সত্ত্বেও রবিবার রাতে জোর করে শরীরটাকে ল্যাপটপের সামনে টেনে বসাতে হয়, জানি তাহলে আপনা থেকেই বেরিয়ে আসবে একটার পর একটা শব্দ- বাক্য। নইলে এই আমিটাই তো মিথ্যে হয়ে যাবে। আমার শিক্ষা মিথ্যে হয়ে যাবে। আমার মনুষ্যত্ব মিথ্যে হয়ে যাবে।

এতগুলো মানুষ! জাস্ট পেটের দায়ে কাজের জায়গা থেকে ঝলসে মরে গেল! একটু মানবিক হলে হয়তো তার মধ্যে অনেক প্রাণ বাঁচানো যেত। কেন এই বর্বরতা? মানুষকে ক্রীতদাসের মত ভেবে বাইরে থেকে তালা দেওয়ার বন্দোবস্ত করা? আজ এখানে আগুন লেগেছে বলে আমরা সাধারণ মানুষ জানলাম। এমনটা নিশ্চয়ই সব গুদামেই হয়ে থাকে! এটাই দস্তুর। কেউ একা করতে তো পারেনা! সিস্টেম নিশ্চয়ই! লুকিয়ে লুকিয়ে করা হয়! যারা জানার তারাই জানে আর মুখে কুলুপ এঁটে থাকে! বিপদে পড়লে চুপ মেরে যায়। কথা সাজাতে হয়, আমাদের দমকল মন্ত্রী যেমন চুপ মেরে গিয়ে ফুটন্ত সাধারণ মানুষের আক্রোশের ভয়ে আগুন নিভে যাবার পর এলেন? যদিও আগে এলেও কিছু আসত- যেত না, তবু ওই আক্রোশের মোকাবিলা করার দম টা রাখলে মানুষ কিছু বলার সুযোগ পায় না, এই আর কি।


আনন্দপুরের নাজিরাবাদের ওই গুদামে মূলত শুকনো, প্যাকেটজাত খাবার মজুত করা থাকত। মজুত রাখা হত ঠান্ডা পানীয়ের বোতলও। গুদামের যাবতীয় সামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে দমকলের তরফে ওই গুদামের কোনও ছাড়পত্র ছিল না। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন খোদ দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার। এমনি এমনি এসব হয়? ওপরে কোনও ছাতার মাথা না থাকলে? এত সাহস হয় কারও? সেই গুদামের মালিককে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। ভালো কথা। কিন্তু সেই ছাতার মাথারা? তাদের টিকি ধরবে কে? আবার হয়তো কোনও গুদাম কোনওদিন পুড়ে খাক হবে, সঙ্গী করে কিছু নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষের লাশকে! মোট ২১টি দেহাংশ উদ্ধার হয়েছে। এদের মধ্যে একটি দেহ আধপোড়া অবস্থায় এবং বাকি ২০টি কঙ্কাল। তবে এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা কত, তা বলা যাচ্ছে না। নিহতদের শনাক্ত করতে দেহাংশগুলি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি (সিএফএসএল)-তে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পরে নিহতদের সঠিক পরিচয় নির্ধারণ করা যাবে। শুধুই দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, এইসব ঘটনাকে? এগুলোতো চায়না মালের মত। গুদামে যারা কাজ করছে শ্রমিকের, তাদের জীবন কতদিন টিকবে, তা হলফ করে বলতে পারবে না ওই গুদামের মালিকেরা। হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটে যেতেই পারে! তা বলে গুদামের গুষ্টির তুষ্টি করতে হবে? তার পেছনে ছাতার মাথারা আছে, কি না তা খোঁজ করে কার বাপের সাধ্যি?

গঙ্গাধরের ‘দখলে’ থাকা গোডাউনের আয়তন ছিল ৩৫ হাজার বর্গফুট। এর মধ্যে ১১ হাজার বর্গফুট মোমো কোম্পানিকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। মালিক দাবি করেছিলেন, মোমো গুদামে অবৈধভাবে Co2 দিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস তৈরির কারণে আগুন লেগেছে। তবে ফরেন্সিক রিপোর্ট সেই দাবি মিথ্যে প্রমাণ করেছে। তদন্তে আরও জানা গেছে, গোডাউনে যথাযথ অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এই ত্রুটির জন্যই মালিক গঙ্গাধরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং উদ্ধারকাজ নির্বিঘ্ন রাখতে বুধবার মধ্যরাত থেকে নাজিরাবাদ এলাকায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী দুর্ঘটনাস্থলের ১০০ মিটারের মধ্যে পাঁচজন বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নরেন্দ্রপুর থানার আইসি-র আবেদনের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রাজ্য সরকার টাকা দেবে, কেন্দ্র সরকার টাকা দেবে, কিছুদিন আওয়াজ উঠবে ব্যাস, সব চুপ। সেই পরিবারগুলোও এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেউ প্রতিবাদ করতে এলেই তাকে শেষ করে ফেলা হবে কোনও অজানা কারনে! দিন কেটে রাত হচ্ছে, রাত কেটে দিন হচ্ছে, এগুলোর মধ্যেই যাপন করতে হচ্ছে আমাদের! মনে হয় না, জবাই করার জন্যই বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ভেতরে কাজ করতে বাধ্য করা হয় ওই শ্রমিকগুলোকে? মানবাধিকার? কী বস্তু? বেঁচে থাকা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার? জানে ওই খেটে খাওয়া মানুষগুলো? বোঝে তারা? বোঝানো হয় তাদের? যাতে আরও না বোঝে, তার জন্যই তো দিনের পর দিন শিক্ষা ব্যবস্থাকে লঝ্ঝড়ে করে দেওয়া হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে। সারা বিশ্ব জুড়েই এই ব্যবস্থা দিন দিন এঁটে বসছে। আজকেই একটা ফেসবুক পোস্টে পড়ছিলাম, পরিসংখ্যান দিয়ে জানানো হয়েছে বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় গবেষণার খাতে অনুদান তলানিতে ঠেকেছে। উচ্চশিক্ষা এখন ধীরে ধীরে বাতুলতায় পর্যবসিত হতে বসেছে সব জায়গায়। ঠেলে, গুঁতিয়ে, লাথি মেরে যারা অট্টহাসি হাসার হিম্মত রাখে, দুনিয়া তাদেরই কুর্নিশ করে! সেগুলোতেই নিজেদের শান দিতে হবে আজকের দুনিয়ায় চলতে গেলে। এই বয়সে এসে তা বিলক্ষণ উপলব্ধি করা যায়।

তবে এটাও ঠিক, গর্জে উঠতেও জানতে হবে। চেঁচাতে জানতে হবে অন্যায় দেখলে। চুপ থাকা চলবে না। যাদের মানবিকতা বোধ আছে, তাদের সেটা নিয়েই অন্যকে লাথি মারা প্র্যাকটিস করতে হবে, ওই মানবতাহীন মানুষগুলোকে ফেলে দেবার জন্য। নইলে সমাজের সত্যিকারের ব্যালান্স সম্ভব নয়। চুপ থাকা মানেই অমানবিকতাকে, নৃশংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া এটা বুঝতে হবে।

প্রতিদিনের খবর এবং বিভিন্ন ফিচার ভিত্তিক লেখা, যেখানে খবরের সত্যতা তথা লেখনীর উৎকৃষ্টতা প্রাধান্য পায়। ফিচার ছাড়াও যে কোনও রকম লেখনী শুধুমাত্র উৎকৃষ্টতার নিরিখে গুরুত্ব পাবে এই সাইটে

Thanks for subscribing!

  • Whatsapp
  • Youtube
  • Instagram
  • Facebook
  • Twitter

The Conveyor

bottom of page