
স্বর্ণালী গোস্বামী
15 Feb 2026
নতুন সরকার সকলের আশা পূরণ করতে পারে কি না সেটাই দেখার
মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের অস্থির অবস্থা কাটিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া মোটামুটিভাবে নির্বিঘ্নে ভোটপর্ব সম্পন্ন হল। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে প্রায় মিলিয়ে যাওয়া একটি দল ২০ বছর আবার মাথা তুলে দাঁড়াল, যা অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে বিবেচিত হবে। মূলতঃ জুলাই বিপ্লবের পর শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং তৎপরবর্তী অস্থির বাংলাদেশ আশা করা যায় এবারে একটু থিতু হতে পারবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় বিক্ষোভ শুরু হয় এবং প্রাথমিকভাবে ২০১৮ সালে বাতিল করা চাকরির কোটা প্রকল্প আদালত কর্তৃক পুনর্বহালের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এর নেতৃত্ব দেয়। শেখ হাসিনা বিক্ষোভকারীদের "রাজাকার" হিসেবে উল্লেখ করার পর কোটার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তীব্রতর হয়। ১০ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকালের সবচেয়ে খারাপ তথা অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ যায়, যেখানে ১৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন বাংলাদেশ পুলিশ দ্বারা। এই অবস্থায় বিক্ষোভকারীরা সম্পত্তি ভাঙচুর করে এবং একটি জাতীয় টেলিভিশন স্টেশন সহ সরকারি ভবনগুলিতে আগুনলাগিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ২১শে জুলাই সুপ্রিম কোর্ট চাকরির কোটা নীতি বাতিল করে রায় দেয় যে ৯৩ শতাংশ চাকরি মেধার ভিত্তিতে প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল, কারণ শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য নাগরিকরা নতুন করে সমাবেশে জড়ো হয়েছিল। তারা নিহতদের বিচারের দাবি জানিয়েছিল এবং একটি নতুন, একক দাবি তুলেছিল - হাসিনার পদত্যাগ। যদিও হাসিনা সেই বছর নির্বাচনে টানা চতুর্থবারের মতো জয়লাভ করেছিলেন, তবুও তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধী শক্তি এবং অন্যান্য ধরণের ভিন্নমত পোষণকারীদের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার, গুম করার পরিকল্পনা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আয়োজন করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। রাজধানী ঢাকার শাহবাগ স্কোয়ারে বিক্ষোভকারীদের বিশাল জনতার উপর পুলিশ রাবার বুলেট এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা সিরাজগঞ্জেও বিক্ষোভকারীরা একটি পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ১৩ জন কর্মকর্তাকে হত্যা করে। সেদিনই ৯০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।
৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং ভারতে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নারী সরকারপ্রধান হিসেবে হাসিনার আমলে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার ছিল, যার মধ্যে ছিল কুখ্যাত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন আধাসামরিক বাহিনী, যা তার বিরুদ্ধে বিরোধী দলের সদস্য ও ভিন্নমতাবলম্বীদের অপহরণ, এমনকি হত্যা এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, বিচার বিভাগ, যা মূলত দ্বিদলীয় প্রতিষ্ঠান ছিল, তার আমলে আপস করা হয়েছিল, যার ফলে একজন প্রধান বিচারপতি একটি রায়ে তার বিরোধিতা করার পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভের পর হাসিনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৯ সালে তিনি আবার ক্ষমতায় আসেন, চিত্তাকর্ষক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করেন, একই সাথে ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন, ১৭ কোটি জনসংখ্যার এবং বিশ্বের অষ্টম-জনবহুল দেশ বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমত এবং বিরোধী দলের উপর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এরপর ছিল মূলধারার গণমাধ্যমকে করায়ত্ত করা। সমালোচকদের মতে, হাসিনা তাঁর বিরোধীদের বিরুদ্ধে একটি আখ্যান তৈরি এবং তা বজায় রাখার জন্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। মূলতঃ শেখ হাসিনা চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের "রাজাকার" হিসেবে চিহ্নিত করে একটি গুরুতর ভুল করে ফেলেছিলেন, বিক্ষোভের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাঁর আসন, যার থেকে পরিত্রানের কোনও উপায় খুঁজে পাননি সে দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রসঙ্গত ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে, এক প্রতিবেদক শেখ হাসিনাকে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলমান চাকরির কোটার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। জবাবে, হাসিনা তুচ্ছ করে মন্তব্য করেন, "যদি মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা [কোটা] সুবিধা না পায়, তাহলে কে পাবে? রাজাকারদের নাতি-নাতনিরা?" এই বক্তব্যের পরেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে মিছিল করে, উস্কানিমূলক স্লোগান দেয়: "তোমরা কে? আমি রাজাকার।" বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলি অবশেষে একটি স্লোগানে মিশে যায়: হাসিনার পদত্যাগ।
আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপিকে পরিকল্পিতভাবে দমন করার জন্য বেআইনি পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা গণগ্রেফতার, বিরোধী দলের সদস্যদের বাসভবনে পুলিশি অভিযান, বিএনপি সমর্থকদের ভয় দেখানো এবং আটকের মাধ্যমে দমন-পীড়ন বৃদ্ধি করেছিল। পুলিশ আওয়ামী লীগের সদস্যদের আক্রমণে হস্তক্ষেপ করেনি, বরং বিরোধী দলের কর্মীদের গ্রেপ্তার করেছিল। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নীরব করতে এবং অর্থপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিযোগিতা নির্মূল করতে বিচার বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করেছিল। বিরোধী নেতাদের কারাবন্দী করে, ভিন্নমত পোষণকারীদের দমন করে এবং কর্মীদের ভয় দেখিয়ে, হাসিনা ক্ষমতার উপর দৃঢ় দখল বজায় রেখেছিলেন, গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলিকে ক্ষুন্ন করেছিলেন। শেখ হাসিনার শাসন বাংলাদেশকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল গণতন্ত্র থেকে একটি নিপীড়ক শাসনে রূপান্তরিত করেছিল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গত প্রায় আঠারো মাসের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্নেও নানা আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে। সরকারের দিক থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, এ সরকারের মূল্য লক্ষ্য ছিল তিনটি- সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার' এবং সরকার ঘোষিত রূপরেখার মধ্যেই সংসদ নির্বাচন আয়োজন। কিন্তু সরকার মোটা দাগে তিন এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সাফল্য দেখালেও সরকারের ভেতরেরই একটি অংশের কারণে সংস্কার কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর বিচারের ক্ষেত্রে 'বিচার নাকি প্রতিশোধ' সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার পাশাপাশি নারীর সমতার ক্ষেত্রটিও এ সরকারের আমলে বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। আমরা দেখেছি, কিভাবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবার সহ আওয়ামী লীগের নেতা- কর্মীদের ওপর নৃশংসতা চলেছে। ভাঙচুর, আগুন লাগানো, শ্লীলতাহানি সেই সময় প্রতিদিনের খবর হয়ে উঠেছিল। হিন্দুদের ওপর দমন, হিন্দু মন্দির ভাঙচুর প্রভৃতি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে চিন্ময়প্রভুর গ্রেফতারি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বাংলা সংস্কৃতির পীঠস্থান ছায়ানটে হামলা ও অগ্নিসংযোগ এবং প্রথম সারির সংবাদপত্র ভবনে অগ্নিসংযোগ বিশ্বের আপামর বাঙালিদের হতবাক করে দিয়েছিল। নিরাপত্তার অভাবে অনেক কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল, যা সাংস্কৃতিক চর্চায় স্থবিরতা সৃষ্টি করে দিয়েছিল। ওসমান হাদির মৃত্যু ঘিরে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল সে দেশে।
বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, আর মব সন্ত্রাস। এই সময়কালে বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর – অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে। কাজেই সেই সময়কালে বাংলাদেশ অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছে তা বলাই বাহুল্য। তবে এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারাটা তাদের জন্য একটি সাফল্য, বিশেষ করে গত বছর রোজায় দ্রব্যমূল্য খুব একটা বাড়েনি বলেই মনে করছেন তারা। তবে আওয়ামী লীগ দল'কে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া বলা ভালো ব্যান করে দেওয়াকে অনেকেই স্বেচ্ছাচারিতা বলে মনে করছেন। এভাবে একটি দলকে ব্যান করা উচিত নয় গণতন্ত্রের নিরিখে।
অবশেষে বাংলাদেশে মোটের উপরে শান্তিতে হয়েছে নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেয়াদ শেষ হতে চলেছে মহম্মদ ইউনূসের। আগামী মঙ্গলবার শপথ গ্রহণ করতে চলেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি- র নতুন সরকার। পালাবদলের আবহে ইউনূসের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল জল্পনা। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে ইউনূস নিজে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বার্তা দেন এখন সেটাই দেখার। ওদিকে বিএনপি নেত্রী তথা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার জন্য পুত্র তারেক রহমান দীর্ঘদিন পর লন্ডন থেকে বাংলাদেশ আসেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনিই দলের দায়িত্বভার নেন। তারপর এই ভোট। তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়াটাই যেন সকলেরই চাওয়া ছিল। তবে জামাতের উত্থান অবশ্যই বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতকেও খানিকটা চিন্তায় ফেলেছে। ‘অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু’ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং সে দেশের নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি এ- ও বলেন, ‘‘ভোটের আগে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পালন করা হবে। যদি বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না- যায়, তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে।’’ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে সে দেশের হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোর দিয়েছেন ঐক্যের উপর। বিএনপি-প্রধানের কথায়, ‘‘দুর্নীতি সরিয়ে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ এবং মানবিক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করতে হবে।’’ তারেক বলেন, ‘‘এই জয় বাংলাদেশের। এই জয় গণতন্ত্রের। আজ থেকে আমরা স্বাধীন।’’ তারেকের মতে, সকলের মত এবং পথ ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু দেশের স্বার্থে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাঁর কথায়, ‘‘আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি। বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’’