
স্বর্ণালী গোস্বামী
31 May 2026
কবে মৃত্যু এসে দুয়ারে কড়া নাড়বে, তার জন্য অপেক্ষা না করে বীরের মত নিজের জীবনের অংক নিজেই মিলিয়ে দেবার স্পর্ধা দেখালেন অনীক
ফের একটা আকস্মিক মৃত্যু। যার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। এই মুহূর্তে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন তুঙ্গে আছে, যে এই মৃত্যু নিয়ে, বিশেষ করে যা গত চারদিন আগে ঘটেছে, তাই নিয়ে যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু মনে হয় কেবলমাত্র রাজনীতি নিয়েই তো আমাদের জীবন নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পায় আমাদের সামাজিক জীবন, তাই সেই কথা মাথায় রেখেই আজকের এই বিষয় নির্বাচন।
একটা মানুষ বলা ভালো ৬৫ বছরের একজন প্রবীণ মানুষ যখন ছাদ থেকে ঝাঁপ দেবার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা সকলের হৃদয়ে লাগে। সেটা আরও প্রবল হয়, যখন জানা যায়, তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। পাশাপাশি এই মানুষটি অর্থাৎ অনিক দত্ত একজন দৃঢ়চেতা মানুষ হিসেবেই সকলের কাছে পরিচিত। কাউকে পরোয়া করেন না। উচিত কথা বলতে পিছপা হননা। আদ্যোপান্ত বামপন্থী ভাবনার মানুষ হিসাবেই পরিচিত ছিলেন পরিচালক অনীক দত্ত। আজকের পরিভাষায় অতি বাম বললেও ভুল হবেনা। 'ভূতের ভবিষ্যৎ' ছবিটি তাঁর কেরিয়ারের গ্রাফ পাল্টে দিয়েছিল। কিন্তু পরে যত দিন গেছে, তিনি তদানীন্তন রাজ্য সরকারের বিরাগভাজন হয়েছেন। সরকারি হলে মুক্তি পায়নি তাঁর ছবি। পারিবারিক জীবনেও ঘটেছে ভাঙন।
চারদিকের পরিস্থিতি যখন আমাদের অনুকূলে না থাকে, তখন আমরা নিজের জীবনের খেই হারিয়ে ফেলি। অবসাদ আমাদের গ্রাস করে। ডিপ্রেশন কথাটা আমাদের, বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ মানুষদের কাছে নতুন একটি শব্দ। আমরা সেই শব্দ এবং সেই অসুখটাকে এখনও ঠিক ঠাউরে উঠতে পারিনি। যদি আমি নিজের জীবনের কথাই ভাবি, জ্ঞান হওয়া থেকে আমার পছন্দ মত কিছুই হয়নি, হতনা। মায়ের ছিল কড়া শাসন, সঙ্গে কঠোর অনুশাসন। ছিল কঠিন পরিশ্রম করানোর পাঠ। সেই হিসেবেই নিজেকে গড়ে তুলেছিলাম, মনের পরিপন্থী হলেও। ছোট থেকেই স্থিতধী এবং স্বল্পবাক আমি অনেক অন্যায় শাস্তির শিকার হয়েছি। মনে হত আমার এই জীবন কেন? রূপকথার জগতে আমার বাস কোনওদিনও ছিলনা। তবে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতাম। আর সেই স্বপ্ন পূরণ করার বাসনা থাকত প্রবল। কাজেই পরিস্থিতি যখন দেখতাম সঙ্গ দিচ্ছেনা, মুষড়ে পড়তাম। এখনকার পরিভাষায় যাকে বলে 'লো' থাকা। আমার জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই সেই খাতে বয়েছে। নিজেরই জন্যে। চাইতাম এই করব, সেই করব- কিন্তু বুঝতাম চারপাশ সেইমতো চলছেনা। শুরু করেছিলাম ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে। কিন্তু ইসলামপুরে ক্লাস এইটে ভর্তি হয়ে সেই যে রেজাল্ট খারাপ হওয়া শুরু হল, তার হাল ধরতে পারলাম না কিছুতেই। মা-কে রেজাল্ট দেখাতাম না। মনে হত এই বেঁচে থাকার মানে কী? সেটাই এখনকার ভাষায় ডিপ্রেশন। আলুয়াবাড়ি রেল কলোনিতে বন্ধু হল অনেক, যা ছোটবেলায় ছিলনা। কিন্তু মনের মত কেউ ছিলনা। ভাবতাম,এরা এরকম কেন? তাও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল প্রবল। আমায় তারা সকলেই ভালোবাসত, বন্ধু ভাবত। তাই একটা মনের টান ছিল অবশ্যই। গ্যাজুয়েশনে মনের মত রেজাল্ট করলাম। নতুন করে আবিষ্কার করলাম নিজেকে। সব যেন সম্ভব মনে হতে লাগল। পর পর সাংঘাতিক কিছু না হলেও ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভাঙছিলাম জীবনের।
আবার হঠাৎ এল জীবনের পরীক্ষার সময়। মা মারা গেল কাউকে কোনও নোটিস না দিয়ে। সারা জীবন মাকে অবলম্বন করেই বেঁচে এসেছি। সে হাজার শাসনে ঘিরে থাকিনা কেন, সব সমস্যার পরিত্রাতাও ছিল আমার মা। গল্পের সাথিও ছিল মা-ই। উচিত- অনুচিতের বিচারক ছিল মা। সে মতের অমিল হলেও জানতাম মা আছে। সেই মায়ের মৃত্যু আমার জীবনকে একেবারে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিল। চারদিকে তখন শুধু বিচারকের দল। কেন এটা করলাম? কেন সেটা করলাম না? কেন এটা বললাম? কেন সেটা বললাম না- তাই দিয়েই আবর্তিত হচ্ছিল আমার জীবন। নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে অস্তিত্ব লড়াইটাই তখন মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছিল। আর ছিল ছোট্ট মেয়ের মুখ চেয়ে বেঁচে থাকার আকুতি। আবার এক ডিপ্রেশনের শুরু। শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ির দিকে ঠেলে, তো বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ির দিকে। আর আমি চিৎকার করে উচিত- অনুচিতের পাঠ শেখাই সকলকে। তাতে কে শিখল বা না শিখল তাতে আমার কিছু যেত- আসত না। তবে সেই সময় আর ছোটটি ছিলাম না। ছোট ছোট আনন্দকে জাপ্টে ধরে বাঁচতে শিখে গেছি তখন। আত্মবিশ্বাস আগের চেয়ে অনেক প্রবল। স্বপ্নগুলো সত্যি হবেই এই সংকল্পকে সঙ্গী করে এগিয়েছি প্রতিটা দিন।
বর্তমানে আমার স্বপ্নের চেয়েও অনেক বেশি প্রাপ্তি হয়েছে আমার এই জীবন থেকে। এবারে সম্পর্কের অবহেলাকে গুরুত্ব না দিতেও শিখে গেছি। একটা অনাবিল আধ্যাত্মিকতার অনুভব বোধ করি নিজের মনের মধ্যে। চাওয়া- পাওয়ার অনেকটাই উর্ধে উঠতে পেরেছি মনে হয়। তাই তরুণ বয়সের কারো আত্মহত্যার প্রবণতা আমার মনকে উদ্বেলিত করে। ভাবি এরা জীবনের সংঘর্ষটাই বুঝে উঠলনা। তার আগেই পৃথিবী থেকে চলে গেল! ঝড়- ঝাপ্টা, বাধা- বিপত্তি পেরিয়ে বিস্তীর্ন এক সবুজ উপত্যকায় পৌঁছনোর নামই তো জীবন। মেয়েকেও বোঝাই, এই জীবন ঈশ্বরের দান। একে উপভোগ করতে জানতে হয়, যথার্থ মানে খুঁজতে পারলে তার চেয়ে সুন্দর উপভোগ্য সময় আর হয়না।
কিন্তু এই বয়সকালের ডিপ্রেশন নিয়ে আমরা কি করব? একটা মানুষ বহু ঝড়- ঝঞ্ঝা পেরিয়ে জীবনের এক প্রান্তে পৌঁছেও কেন নিজেকে শেষ করে দেবার কথা ভাববে? তার জন্য দায়ী অবশ্যই আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক জীবন। পাশাপাশি আমাদের বন্ধু মহল। ইদানিং যুক্ত হয়েছে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত সোশ্যাল মিডিয়া। সারাক্ষণ বিভিন্ন রকম চাপের মধ্যে আমাদের থাকতে হচ্ছে। এই ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন যদিও ওষুধে সারে, কিন্তু তার জন্য একটা ন্যূনতম সময় তো প্রয়োজন! তার মধ্যেই কেউ যদি ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন নিজের জীবন নিয়ে তাহলে? তাহলেই তো আমাদের অনীক দত্তের মৃত্যুর মত হতবাক মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। শহরে এখন এই একলা হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন হু হু করে বাড়ছে। তার সঙ্গে যদি এমন সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন প্রবীণ মানুষেরা, তাহলে তো ভবিষ্যতে আশঙ্কার সমূহ সম্ভাবনা! যা নিয়ে অবিলম্বে ভাবার দরকার। এক্ষেত্রে কাউকে দোষ দিয়ে কি আদৌ কোনো লাভ আছে? সামগ্রিকভাবে আমাদের পরস্পর পরস্পরকে বুঝতে হবে এবং নিজেদের মনকে সেই কঠিন বাস্তবের সামনে একা দাঁড়ানোর মত শক্ত করে গড়ে তুলতে হবে আমাদের নিজেদেরই। তবেই তা সম্ভব।
তবে এক্ষেত্রে আর একটা দিক নিয়েও অবশ্যই আলোচনা করার দরকার। যাঁরা অনীক দত্তকে চিনতেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে আবার বলছেন, এমন আপোষহীন লোক, জীবনের মানে যখন খুঁজতে পারছেন না, তাঁর গুরুত্ব কারো কাছে অনুধাবন করতে পারছেন না, তখন নিজের জীবনের শেষ কবে হবে, কেমন হবে- তাও তিনি নিজেই স্থির করে নিলেন। কবে মৃত্যু এসে দুয়ারে কড়া নাড়বে, তার জন্য অপেক্ষা না করে বীরের মত নিজের জীবনের অংক নিজেই মিলিয়ে দেবার স্পর্ধা দেখালেন। কোথায় কিভাবে তাঁর জীবন শেষ হবে তা নিজেই স্থির করে তাই করে দেখালেন, কাউকে আগাম কোনও আভাস না দিয়ে! সেটাও হতে পারে। আমার মনে হয় নিজের শর্তে বাঁচা, নিজের কথা গলা তুলে বলা অনীক দত্তের এই স্বেচ্ছামৃত্যু এমনভাবে বললেই হয়ত ভালো লাগবে। ডিপ্রেশনে গিয়ে কোনোদিক সামলাতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন তেমনটা না ভাবলেই বোধহয় তাঁকে যথার্থ সম্মান দেওয়া হবে।