টানা বৃষ্টিতে শহর বিপর্যস্ত দিনভর, রাতেও জমা জলের কিনারা হয়নি অনেক জায়গাতেই
- The Conveyor
- Sep 23, 2025
- 3 min read

কলকাতা, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫: তুমুল বৃষ্টিতে ভাসল শহর কলকাতা। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিতে কলকাতা-সহ একাধিক এলাকা জলমগ্ন। একাধিক বাড়ির ভিতরে জল ঢুকেছে। কোথাও হাঁটু সমান, তো কোথাও কোমর সমান জল। রাস্তায় বেরিয়ে বিপদে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কলকাতার বেহাল পরিস্থিতিতে কন্ট্রোল রুম খুলল নবান্ন। জমা জলের কারণে কোথাও সমস্যায় পড়লে জানানো যাবে সরাসরি নবান্নে। দুটি টোল ফ্রি নম্বর দেওয়া হয়েছে তার জন্য। নম্বরগুলি হল— (০৩৩) ২২১৪ ৩৫২৬, (০৩৩) ২২৫৩ ৫১৮৫। এ ছাড়া যে্ টোল ফ্রি নম্বর দেওয়া হয়েছে, সেগুলি হল— ৮৬৯৭৯৮১০৭০ ও ১০৭০। জমা জলের কারণে যেকোনও সমস্যায় পড়লে এই নম্বরে ফোন করে সাহায্য চাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। অপরদিকে মঙ্গলবার সকালেই পুরসভার কন্ট্রোল রুমে পৌঁছন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। সেখান থেকে তিনি শহরবাসীকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন।
কলকাতা পুরসভার কন্ট্রোল রুম থেকে ফিরহাদ হাকিম বলেন, '৫-৬ ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটার কিংবা তার বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ভয়াবহ অবস্থা। আমরা লক গেটগুলি খুলে দিয়েছিলাম, কিন্তু জল বাউন্স ব্যাক করে চলে আসছে। দেড়টার সময়ে একটা বড় বান আসার কথা রয়েছে। সেটা চলে গেলে হয়তো আমরা জলটা ঠিকমতো ফেলতে পারব। পুরো পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছি। জরুরি পরিষেবার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সবরকম ভাবে সাহায্য করার জন্য কেএমসি যথাযথ কাজ করছে।' এর পরেই তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি সবাইকে অনুরোধ করছি, যতক্ষণ না জল নামছে, দয়া করে বাড়িতে থাকুন। নিরাপদ থাকুন। যদি বাইরে থাকেন, তাহলে ল্যাম্পপোস্ট ও বিদ্যুতের খুঁটি স্পর্শ করবেন না। কারণ জলমগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।'
মঙ্গলবার সকালে শহরে একের পর এক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বেনিয়াপুকুর, গড়িয়াহাট, নেতাজিনগর, কালিকাপুর ও একবালপুর থানা এলাকা-সহ আরও কয়েকটি জায়গায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় মোট ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় বিষ্ণুপুরে একজন ও উত্তর ২৪ পরগনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। একের পর এক বিদুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় তৎপর সিইএসসি (CESC)। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে তারা বলেছে, ‘দয়া করে জল জমে থাকা রাস্তায় বিদ্যুতের খুঁটি, পিলার-বক্স কিংবা বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকুন। যে কোনও প্রয়োজনে ০৩৩ ৩৫০১ ১৯১২ নম্বরে ফোন করুন।’
পুজোর আর দিন তিনেক বাকি। বেশ কিছু পুজো প্যান্ডেলে ইতিমধ্যেই দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থায় সোমবার রাতের বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত বেশ কিছু পুজো প্যান্ডেল। বানভাসি শহরের কোথাও ভেঙে পড়েছে মণ্ডপের একাংশ, কোথাও হাঁটুজল জমে গিয়েছে প্যান্ডেলের ভিতরে। শারদোৎসবের সময় এমন নজিরবিহীন বৃষ্টি এর আগে দেখেনি কলকাতা। ট্রেন লাইন ও মেট্রো লাইনেও জল ঢুকে গিয়েছে। বাস পরিষেবা বেহাল রাস্তায় জল জমে থাকার কারণে। কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বেশ কিছু ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। অন্তত ১০০টি বিমানের যাত্রা হয় বাতিল নয় পিছিয়ে দিতে হয়েছে সোমবার রাতের বৃষ্টির পর থেকে। রিপোর্ট মোতাবেক, ৬২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, অন্যদিকে ৪৪টি বিমানের সময় পিছিয়ে দিতে হয়েছে। মঙ্গলবার জল ঠেলে আদালতে পৌঁছোতেই পারলেন না কর্মী, আইনজীবীরা। তার জেরে মঙ্গলবার দিনভর শুনানির কাজ বন্ধ থাকল কলকাতা হাই কোর্টে। কলেজ স্ট্রিটের একাধিক প্রেস, দোকান বিপর্যস্ত, জলের তলায় কাগজ, যন্ত্রপাতি সহ বইপত্র। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস জানিয়েছে মঙ্গলেও বৃষ্টি হওয়ার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পুরুলিয়ায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও, নদীর ওপারের অন্যান্য জেলা অর্থাৎ পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়ায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কমলা সতর্কতা জারি থাকবে এইসব জেলাগুলিতে। বাকি সব জেলায় আজ হলুদ সতর্কতা থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুসারে, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় কলকাতায় দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২,৬৬৩ শতাংশ বেশি। নিম্নচাপের প্রভাবে পুঞ্জীভূত মেঘ থেকেই এত বৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ১৯৭৮ এবং ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে ২৫১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল কলকাতায়। সেই হিসাবে এটি শহরে বৃষ্টির ষষ্ঠ রেকর্ড।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। কিন্তু শহরের পরিস্থিতি বিশেষ বদলায়নি। সল্টলেক-সহ বিধাননগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখনও কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও কোমর ছুঁইছুঁই জল। পাম্পের সাহায্যে জল নামানোর কাজ চলছে। বিধাননগর পুরসভা জানিয়ে দিল, সর্বত্র জল জমে থাকার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে সল্টলেকের অলিতে গলিতে বন্ধ রাখা হবে সমস্ত পথবাতি। জল না-নামা পর্যন্ত আলো জ্বলবে না সল্টলেকের কোনও রাস্তায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকেই সল্টলেকের সমস্ত রাস্তায় পথবাতি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।













Comments