আচমকা হড়পা বানে টালমাটাল নেপাল, নিখোঁজ ১৪২ জন ভারতীয় পর্যটক, বিহার- উত্তরপ্রদেশে সতর্কতা জারি

২৬ অগাস্ট, ২০২৬: তিব্বত সীমান্ত থেকে হঠাৎ নেমে আসা প্রবল জলস্রোতে ভয়াবহ বন্যার কবলে নেপালের রাসুয়া জেলা। নেপাল-চিন সীমান্তে বুধবার হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে বহু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকের খোঁজই পাওয়া যায়নি। বুধবার সকালে ভোটে কোশি নদীতে আচমকা জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় টিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাজার, বাড়িঘর, রাস্তা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো জলের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের খবর, বুধবার সকাল প্রায় ৯টার দিকে আচমকাই নদীতে ভয়ঙ্কর জলস্রোত দেখা যায়। কয়েকটি এলাকায় বন্যার জল এত দ্রুত ঢুকে পড়ে যে মানুষজন নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ারও সময় পাননি। টিমুরে বাজারের বিস্তীর্ণ অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাসুয়া সীমান্ত শুল্ক দফতর এলাকাতেও বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গিয়েছে। গাড়ি-সহ বিভিন্ন সামগ্রীও জলের তোড়ে ভেসে যাওয়ার প্রাথমিক খবর রয়েছে। বানের সেই মুহূর্তের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কী ভাবে নদীর প্রবল স্রোত, কাদামাটির তাল এবং পাথর ছুটে এসে এক লহমায় গিলে নিয়েছে আস্ত লোকালয়কে, তা ধরা পড়েছে সিসি ক্যামেরায়। যা ভয়ানক একটা অনুভূতি জাগায়। উজানে নদীর গতিপথে একটি বাধা তৈরি হওয়ায় ফের জলোচ্ছ্বাস বা দ্বিতীয় দফার বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। সেই কারণেই নদীর তীরবর্তী এবং নীচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সে দেশের পর্যটন পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক-সহ অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটকের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাঁদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় (৩৭ জন অনাবাসী-সহ) রয়েছেন। তাঁরা কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনে যাচ্ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। যত দ্রুত সম্ভব নেপালে ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছে নয়াদিল্লি। উদ্ধারকাজেও নেপালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে হাত লাগিয়েছে ভারত। উদ্ধারকাজ শুরু হলেও পরিস্থিতির কারণে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলকে। বন্যার জলে স্থানীয় হেলিপ্যাড সম্পূর্ণ ভেসে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে হেলিকপ্টার নামানো যায়নি। পরে অবশ্য নেপাল সেনাবাহিনীর একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার চিকিৎসক ও জরুরি উদ্ধারকারী দল নিয়ে সেখানে গেছে।
এই বন্যায় নেপালের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাসুয়াগঢ়ী, চিলিমে এবং ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ত্রিশূলী-৩বি কেন্দ্রের ২২০ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং একাধিক সঞ্চালন ও বণ্টন পরিকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের জেরে উদ্বেগ বাড়ছে ভারতেও। বিশেষ করে বিহার ও উত্তরপ্রদেশে জারি করা হয়েছে সতর্কতা। নেপাল থেকে ভারতে প্রবাহিত গণ্ডক-সহ নদীগুলির জলস্তরের দিকে কড়া নজর রাখছে প্রশাসন। বিপর্যয় এড়াতে বিহারে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় NDRF এবং SDRF-এর দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিহারের প্রশাসন ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতিতে নজর রাখছে। পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, মুজফ্ফরপুর এবং বৈশালীর মতো জেলাগুলিতে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নেপাল থেকে ভারতে বয়ে আসা নদীগুলির কারণে উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগরকে বিশেষ ভাবে সতর্ক করা হয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জলস্তর ও প্রশাসনের আপডেটের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এই আচম্বিতে হড়পা বানের কারন হিসেবে বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করছেন, তুষারধসের কারণেই বুধবার নেপালের ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান নেমেছিল। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পরে জানিয়েছেন, তুষারধসের জেরে পাথর ও বরফের স্তূপে অবরুদ্ধ হয়েছিল নদীর গতিপথ। জমে যাওয়া জলের চাপে হঠাৎই সেই ‘অবরোধ’ ভেঙে যায়। ফলে সৃষ্টি হয় হড়পা বান। হিমবাহের বরফগলা জলে পুষ্ট কোনও হ্রদও ফেটে গিয়েছিল বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার নেপাল পার্লামেন্টে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল জানান, সকাল ৮:৩৭ নাগাদ একটি ভূমিকম্প হয়। এর পর একটি তুষারধস ঘটে। তিনি বলেন, ‘‘সরকারের প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভোটেকোশীতে হড়পা বান ৮:৪০ নাগাদ শুরু হয়। বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানের কাজ এখনও চলছে।’’
তুষারধসের কারণে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বানের বিপদসঙ্কেত দেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালের এক গবেষণায়। তাতে বলা হয়েছিল, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে এই শতাব্দীর গোড়া থেকে শুরু করে প্রতি বছর দেড় ফুটেরও বেশি উচ্চতার বরফ গলে যাচ্ছে হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে। ভারত, চিন, নেপাল, ভুটান, চিন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৪০ বছর ধরে উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি করা গবেষণাপত্রটি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল। হিমালয় জুড়ে উন্নয়নের নামে বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত নির্মাণ, সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ বন্ধ না হলে বর্ষার মরসুমে বন্যা ও ভূমিধসের মোকাবিলা করা কঠিন হবে বলেও জানানো হয়েছিল। গত চার দশকে হিমবাহগুলির চার ভাগের এক ভাগই গলে গিয়েছে।









Comments